Colorgeo

Classroom of Money and Wisdom for Earth Science

বেদ ও আমার দর্শন-অহিংসা

Spread the love

বেদ ও আমার দর্শন

বেদচীনের মত জাপানেও ধর্মের আচরণগত অভ্যাস পালন করার বাধ্যগতকতা নেই। মানুষের মধ্যে এখানে বেশিরভাগ মানুষই ধর্মের চর্চা করে না। যারা চর্চা করে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রকৃতি প্রেমী অর্থাৎ প্রকৃতিকেই তারা গড বলে বিশ্বাস করে। এ কারণেই জাপানে দেখা যায় বহু ঈশ্বরের প্রভাব অর্থাৎ প্রকৃতিতে যেসব প্রাণী গাছপালা দেখা যায় সেগুলোকে তারা একেকটা গড হিসেবে উপাসনা করে। আমি যেখানে থাকি জাপানের ইয়ামাগুচি এবং মৎসুমতো এরিয়া সেখানে আমি রাস্তার ধারে বাড়ির দরজায় উঠানে দোকানের সামনে ব্যাঙের মূর্তি দেখেছি। রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অথবা ব্যাংকের বারান্দায়।  তারা একে প্রকৃতির একটি উপাদান হিসেবে দেখে এবং তাকে গড হিসেবে পূজা করে। আমরা যেমন স্বর্গ নরক বিশ্বাস করি তারা মৃত্যুর পরে স্বর্গে যাবে অথবা নরক যন্ত্রণা ভোগ করবে এই ধরনের বিশ্বাসে তারা অভ্যস্ত নয়। তারা প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করে এবং সেই শ্রদ্ধা থেকেই মূলত উপাসনার একটি ধারা চলে আসে। তবে এখানে কোন বাধ্যবাধকতা নেই এই ধরনের চর্চা করার জন্য ।

জাপানের ইয়ামাগুচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই একটি পাহাড় সংলগ্ন বনের ভিতরে সরু রাস্তা ধরে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম আমার বন্ধু ও ল্যাবের প্রফেসর এর সাথে। সেখানে আমরা একটি মন্দিরে প্রবেশ করলাম। তবে সে মন্দিরে কোন দেবতার মূর্তি নেই। এটা অরণ্যের মাঝে একটি মন্দির জাস্ট প্রকৃতিকে তারা উপাস্য দেবতা হিসেবে গণ্য করে তাই বনের ভিতর সেই মন্দির সুউচ্চ পাথরের গেট পার হয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং সেখানে গিয়ে ধর্মীয় রীতি অনুসারে জল দিয়ে হাত ধুয়ে আমরা দুই হাত তালি দিয়ে মন্দিরের অদৃশ্য দেবতাকে জাগ্রত করলাম এবং প্রণাম করে আমাদের মনের বাসনা পূরণ করার জন্য প্রার্থনা করলাম। এরপরে আমরা জাপানি সমমূল্যের ১০০ জন জাপানি দান বক্সে প্রদান করলাম এবং আমাদের ভাগ্যে ভালো কিছু যাতে থাকে এই প্রার্থনা করলাম। এরপরে আমরা সেখান থেকে বের হয়ে চলে আসলাম। এটাই হলো জাপানিজদের ধর্ম উপাসনা।

এবার আমি ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় রীতি-নীতির বিষয়ে কথা বলব। ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ, এই তিনটি দেশেই হয়তো সব থেকে বেশি ধর্মীয় সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। কত শত মানুষ মারা গিয়েছে এই সংঘাতে, এই ধর্ম বিশ্বাস একটি অদৃশ্য বিশ্বাস মাত্র। কোন ধর্মের দেবতা বা স্রষ্টা কত শক্তিশালী সেটাই মূলত এই সংঘাতের মূল। কেউ যদি অন্যের ধর্মের চর্চা না করে তবে বিধর্মীরা রাগান্বিত হয়। শোষিত হয় এবং বাড়ি ঘরে আক্রমণ করে এমন কি জীবন পর্যন্ত দিতে হয় সংঘাতে। এ এক অদ্ভুত নিয়ম। কিন্তু জাপানে এই ধরনের কোন চর্চা নেই সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যে যার বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারে আচরণ করতে পারে। 

 

ছোটবেলায় দোল পূর্ণিমার সময় আমাদের বাড়িতে একটি ধুমধাম আয়োজন হতো। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের শৈশব স্মৃতি নিয়ে বিভিন্ন রঙে ঢঙে ছোট কৃষ্ণ গোপালকে সাজানো হতো। সাজানোর রেওয়াজ ছিল এখনও রয়েছে। বাংলাদেশে আমি যখন ছোট ছিলাম বয়স ৭ থেকে ৮ বছর হবে তখন। দেখতে অনেক সুন্দর ছিলাম। সব বাচ্চারাই সুন্দর থাকে ছোটবেলায়। তাই আমাকে সবাই বেছে নিল গোপাল সাজানোর জন্য। আমাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে গোপালের মতো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শৈশব লীলা উদযাপন করার জন্য। সমস্ত গ্রাম ঘুরে আবার আমাদের বাড়িতে ফিরে আসতো। প্রতিটি বাড়িতে যখন আমি প্রবেশ করতাম আমার পিছনে থাকতো কীর্তনের গায়ক দল এবং দর্শনার্থী। প্রতিটি বাড়িতে প্রবেশ করার পরেই উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকতাম অতি দ্রুত বাড়ির মহিলারা আমার পা পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে দিত এবং আমাকে নমস্কার করে আমার মিষ্টিমুখ করানো হতো এবং আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হতো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে। সে দৃশ্য গুলো আমার এখনো পরিষ্কার মনে আছে। বর্তমানে দুর্গাপূজায় বিসর্জনার দিনে যেভাবে মা দুর্গাকে শেষ বিদায় জানানো হয় এবং মিষ্টিমুখ করানো হয় সেভাবেই বাড়ির মহিলারা একে একে আমাকে সন্দেশ একটু জল খাওয়াতো এবং সমস্ত প্রথাগত কার্যসম্পন্ন করে আমরা অন্য বাড়িতে যাওয়ার জন্য রওনা হতাম আমার পিছনে বাজতে থাকতো কীর্তন গান 

আমাদের বাড়িতে প্রতিদিনই গান হতো কীর্তন হতো নিয়মিত। আমার শৈশব কেটেছে আমার মামা বাড়িতে সেখানে মামা বাড়িতে দুর্গাপূজা হত প্রতিবছর খুব জাঁকজমক করে দূর্গা পূজার জন্য আগ্রহ নিয়ে আমরা প্রতিবছর অপেক্ষা করতাম। অনেক ভক্তি ভরে পূজা অর্চনা করতাম অঞ্জলি দিতাম। মা দুর্গার কাছে আমি অনেক প্রার্থনা করতাম সবাইকে ভালো রেখো এবং ভবিষ্যৎ উন্নত করে দাও হে মা দুর্গা তুমি। দুর্গাপূজার শেষের দিন বিসর্জনের দিনে আমরা বিরহ বেদনা অনুভব করতাম। আমরা যেন সব কিছু হারিয়ে ফেলেছি এতটাই ভালবাসতাম দূর্গা মাকে এবং কান্না করতাম। আমার জিতেন মামা কান্না করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যেত মা দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়ার শোকে ।

মামা বাড়িতে থাকার সময় একটি বই ধর্মীয় বই আমাকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে সহায়তা করেছিল আমার মনে যেমন অনেক প্রশ্ন ছিল কেন পৃথিবীতে এত ধর্ম শেষ করে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইসলাম আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ লিখিত একটি বই “ব্যাক টু গড হেড” এর বাংলা অনুবাদ এবং সেখানে বইটিতে লেখা ছিল যে পৃথিবীতে যত প্রশ্ন রয়েছে সব উত্তর পাওয়া যাবে এই বই পড়লে এবং আমি বইটি পড়ার পরে যথেষ্ট উত্তর খুঁজে পেয়েছিলাম এবং সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকনের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করেছিলাম প্রভুপাদকে ধন্যবাদ। 

পৃথিবীতে বিদ্যমান হাজার হাজার ধর্মকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছিলাম। তখন মনকে এভাবে শান্তনা দিয়েছিলাম যে হাজার হাজার মত পথ থাকলেও স্রষ্টা একজনই। আমাদের হিন্দু ধর্মের যে উপাখ্যান রয়েছে, দশ অবতার, বরাহ অবতার পূর্ণ অবতার এবং শেষ কল্কি অবতার। এ অবতার গুলোপ্রতি যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। যখনই ধর্মের গ্লানি অধর্মের উত্থান তখনই ভগবান অবতার রূপে ধরাধামে আবির্ভূত হয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। আমি যখন উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের পড়াশোনা করতে গেলাম তখন পৃথিবীর ইতিহাস সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে একটি ধারণা পেয়ে গেলাম। পৃথিবী যে এত অল্প বয়সের নয় সেটা প্রথম বুঝতে পারলাম। পৃথিবীর বয়স ৪৬০ কোটি বছর এবং ৫৩০ মিলিয়ন বছর অর্থাৎ ৫৩ কোটি বছর থেকেই এই পৃথিবীতে প্রাণীকুলের আবির্ভাব। ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া জাতীয় সরলতম এককোষী প্রাণী থেকে প্রাণের সৃষ্টি যা জলের সংস্পর্শে প্রাণীর উদ্ভব হয়েছিল। সমুদ্রের তলদেশে কোন এক অজানা পরিবেশে। যেহেতু ধর্ম এবং প্রাণীকুলের সৃষ্টি কে আমি সবসময়ই অনুসন্ধিতশু মন নিয়ে ভেবেছি এবং খোঁজার চেষ্টা করেছি।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর ইতিহাস সম্বন্ধে পড়াশোনা করতে গিয়ে হিন্দু ধর্মের সাথে অবতার গুলোর সাথে পৃথিবীর ইতিহাসের একটি সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলাম এবং মনে হল উত্তর পেয়েও গেলাম। বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে যেমন সমুদ্র থেকে প্রাণের উদ্ভব ধীরে ধীরে এককোষী থেকে বহু খুশি এবং জলভাগের প্রাণী থেকেই স্থলভাগের প্রাণীতে বিবর্তন এরপরে শিম্পাঞ্জি এবং সর্বশেষ মানুষের উত্থান এই বিবর্তনের ধারা যেন হিন্দু ধর্মের দশ অবতারের সাথে একটি সামগ্রিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বিস্তারিত কখনো চিন্তা বা গবেষণা করা হয়নি। তবে মনে একটা সান্তনা পেয়েছিলাম যে হয়তো হিন্দু ধর্মের অবতারগুলো বিজ্ঞানের সাথে কিছুটা মিল থাকতে পারে কারণ অবতার গুলোর বর্ণনা মূলত ঋষিরা আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে লিখেছেন যা অনেকটাই বিজ্ঞানের ভিত্তিতে নয়। সেক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি কিছুটা থাকতেই পারে। এভাবেই মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দু ছাত্রছাত্রীদের জন্য মন্দির স্থাপনের জন্য সক্রিয় সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি মন্দির স্থাপন করতে হবে এবং ধর্মীয় নির্দেশনা গুলো তখন খুব মনোযোগ সহকারে পালন করতাম বিশেষ করে গীতার বাণী গুলো শতভাগ সত্য বলে মেনে চলতাম। অন্তত চেষ্টা করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় সদস্যরা ধর্ম প্রচারের জন্য আসতো এবং সেখানে গীতা প্রদান করত। আমরা গীতা পাঠ করতাম প্রতি শুক্রবারে এবং আমরা সাপ্তাহিক ধর্মীয় প্রার্থনা ও আলোচনা করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের আমি একবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত দায়িত্ব যেন আমার কাঁধে চলে আসলো। বিশ্ববিদ্যালযয়ে আমি আমার ব্যস্ততম সময় কাটিয়েছি ধর্মের পথে নিজেকে সমর্পণ করে। 

গীতার একটি কথা আমি সর্ব মেনে চলতাম -সকাম কর্ম নয় নিষ্কাম কর্ম কর । অর্থাৎ কাজ করে যেতে হবে কোন ধরনের ফলের আকাঙ্ক্ষা না করে। এটা গীতার কর্ম যোগের সার কথা। 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শেষে অনুভব করেছিলাম যে এই কর্মযোগ অনুশীলন করার কারণে আমার জীবনে ভালো ফল পেয়েছিলাম। এই সময়টাতে আমি নিজেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আত্মনিবেদন করার জন্য মানুষকে উৎসাহ দিয়েছিলাম। কোন কাজ করার সময় ফলের আকাঙ্ক্ষা না করলে সেই কাজে শান্তি পাওয়া যায়। এটা আমি অনুভব করেছিলাম কারণ আমাদের অশান্তির মূল হলো প্রত্যাশা কোন কাজ করতে গিয়ে আমি যদি কোন প্রত্যাশা না করি সেখান থেকে উদ্ভূত কোন ফল আমাকে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না অন্যথায় শান্তি থাকে না অশান্তি থাকে না কারণ সেই কাজের বিনিময়ে আমি তো কোন কিছু চাইনি তাই প্রত্যাশাও থাকে না অর্থাৎ সুখ লাভ করার এটা একটি উপায়। 

পৃথিবীর সমস্ত ধর্মকে যখন এক সুতো এই গাঁথার চেষ্টা করতাম তখন গীতা থেকে একটি জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিলাম সেটা হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণই হলো সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিকর্তা এবং কৃষ্ণ হলেন ভগবান স্বয়ং। কৃষ্ণ মানুষের মত দেহ ধারণ করেছিলেন কারণ ধর্মীয় ব্যাখ্যায় একটি নির্দিষ্ট সময় পরে মানুষের রূপ ধারণ করেন। ভাগবতে বিস্তারিত লেখা রয়েছে। যাই হোক সে ব্যাখ্যায় যাব না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হল স্রস্টার সাকার রূপ সৃষ্টিকর্তা এবং তার একটি নিরাকার রূপ রয়েছে যাকে আমরা বলি ব্রহ্ম। ইসলাম ধর্মে যাকে বলা হয় আল্লাহ। আমি এভাবে একটি সূত্রে গাধার চেষ্টা করেছিলাম। সূর্য যদি হয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার জ্যোতি বা কিরণ হবে ব্রহ্ম বা আল্লাহ অর্থাৎ নিরাকার রূপ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তার থেকে নির্গত তার যে শক্তি সেটা হল নিরাকার রূপ। সূর্যের জ্যোতি কে বাদ দিয়ে যেমন সূর্যকে কল্পনা করা যায় না আবার সূর্য না থাকলেও জ্যোতি থাকে না তাই একে অপরের পরিপূরক। তাই ভগবানকেসাকার ও নিরাকার দুই ভাবেই কল্পনা করা যায়। একটি পাহাড়কে আমরা যত উপায়ে দেখি না কেন প্রত্যেক ভাবেই ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখতে পাব। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রেও তাই। যে যেভাবেই ভগবানকে দেখুক বা ডাকুক না কেন প্রত্যেকেরই রূপ আলাদা আলাদা হবে। কারো কাছে ভগবান সাকার, কারো কাছে নিরাকার এভাবেই এক সূত্রে গাথা যায় স্রস্টাকে। 

বেদ কি বহু উপাসক অনুমতি দেয়?

আমাদের হিন্দু ধর্মের মধ্যে অনেক মত এবং পথ রয়েছে কেউ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত কেউ কালির ভক্ত, কেউ শিবের উপাসক এভাবে হাজার হাজার মত এবং পথ রয়েছে। কেউ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকনের মতাদর্শে চলে কেউ রামকৃষ্ণ মিশনের অনুসারী। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন যত মত তত পথ কথাটা যথার্থই বলেছেন শ্রীকৃষ্ণ বলেছে যে যেভাবে উপাসনা করবে আমাকে ঠিক সেভাবেই সে আমাকে প্রাপ্ত হবে। কেউ ভুতের উপাসনা করলে মৃত্যুর পর সে ভূত লোকে যাবে, কেউ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে উপাসনা করলে ভগবানের দিব্য ধাম প্রাপ্তি হবে। জন্ম মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারবে।এগুলো হল দর্শন যে মৃত্যুর পর কে কোথায় যাবে এই দর্শন মানুষ বিশ্বাস করে বলেই এতোটা বছর এই বিশ্বাস টিকে আছে। আমি  সর্বদাই পৃথিবীর সমস্ত ধর্মগুলোকে শ্রদ্ধা করি এবং সম্মান করি একটি সুত্রে গাধার চেষ্টা করেছি। আমি সবসময় তাই ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের আদর্শ আমাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না, তাদের ধর্মীয় রীতি নীতি তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারো ব্যক্তি গত বিষয়ে নাক গলানো উচিত নয়। 

কেউ যদি ভূতের উপাসনা করে তাতেও আমার যেমন কোন লাভ বা ক্ষতি নেই। কেউ আল্লাহ বা ভগবানের উপাসনা করলেও তাতে আমার বিন্দুমাত্র বিচলিত হওয়ার সুযোগ নেই কারণ এগুলো সবই বিশ্বাস। যে কেউ যে কোন কিছুতে বিশ্বাস করতে পারে এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে উচ্চ শিক্ষার জন্য আমি যখন জাপানে প্রবেশ করলাম তখন আমার মধ্যে ধর্ম সৃষ্টিকর্তা এবং বিজ্ঞান বিষয়ে এক নতুন ভাবনার উদ্ভব হলো। জাপানের মানুষগুলোর ব্যবহার সামগ্রিক ব্যবস্থা এবং নীতি নৈতিকতা একনিষ্ঠতা সময় অনুবর্তিতা ও সততা দেখে,দেশপ্রেম দেখে আমার ভারতীয় উপমহাদেশের অতিমাত্রায় ধর্মকে চর্চা করার দেশগুলোর সাথে তুলনা করতে ইচ্ছে হলো।ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তান যেখানে অতিমাত্রায় ধর্মকে লালন করে এবং ধর্মের ঐশ্বরিক বাণী গুলোকে বেদবাক্য হিসাবে  মেনে চলে, সেখানে কেন এত দুর্নীতি অন্যায় অনুন্নয়ন সংঘাত? অন্যথায় জাপানের বেশিরভাগ মানুষ নির্দিষ্টভাবে কোন ধরনের অনুসারী নয় তবুও কেন তারা এত সুশৃংখল উন্নত সুবিন্যস্ত ব্যবস্থা নৈতিক আদর্শ? কেন এত উঁচুতে?  সর্বোপরি তারা কোন ধর্মে বিশ্বাস করে না সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে না এই বড় প্রশ্ন আমার মধ্যে এক ভাবনার ইন্দ্রজাল তৈরি করল। পরে অবশ্য জেনেছি যে প্রকৃতিই তাদের ঈশ্বর। 

জাপানের তোহকু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা অবস্থাতে আমি পৃথিবীর ইতিহাস নিয়েই মূলত গবেষণা করেছি এবং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর ইতিহাস কে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে আরো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার চেষ্টা করেছি। সেখানে দেখেছি যে পৃথিবীর ইতিহাস এত সরলতম নয়। এক বিশাল কর্মযোগ্য। পৃথিবী ইতিহাস শুরু হয়েছে ৪৬০ কোটি বছর থেকে কিন্তু ধর্মের উত্থান হয়েছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত হাজার বছর আগে। সময়ের এক বিশাল ব্যবধান। পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে কোন মানুষ ছিল না। মানুষের আবির্ভাব মাত্র এক লক্ষ বছর আগে থেকে আনুমানিক। তাহলে ধর্মের বয়স অতি অল্প পৃথিবীর বয়সের তুলনায়। সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে তুলনা করলে ধর্মের আবির্ভাব একেবারেই ক্ষুদ্র সময়ে। পৃথিবীতে এক লক্ষ বছর আগে মানুষের আবির্ভাবের পূর্বেও বৃহৎ আকারের প্রাণী ডাইনোসরেরা ১৬ কোটি বছর ধরে বসবাস করেছে। এই পৃথিবীতে তার প্রমাণ আমরা পাই গত ৬ কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া ডাইনোসরের হাড়গোড় দেখে। বৃহৎ ফসিল। পৃথিবীতে মানুষের বসবাস অতি ক্ষুদ্র সময় পার হয়েছে। তাহলে কি ধর্মের উদ্ভব উত্থান মানুষের তৈরি? 

তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার সময়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব তারা বিশ্বাস করে কিনা তারা দৃঢ়ভাবে বলেছিল কেন নয়? এটা তো বিজ্ঞান। একেবারেই সাধারণ বিষয়। সুস্পষ্ট কারণ বিবর্তন এখনো চলমান। এটা একেবারেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখানে কোন মতভেদ থাকতে পারে না। তাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম তারা সবাই ডারউইনের তত্ত্বকে বিশ্বাস করে এবং শতসিদ্ধ বলে মনে করে। 

ধর্মের চর্চা না করেও জাপানিজরা যদি এত উন্নত হতে পারে, এত সুশৃংখল ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে তবে কেন তাদের সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই এই ভাবনা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। 

আমাদের ধর্মগ্রন্থে স্পষ্ট বলা রয়েছে যে এই জগতে যতই মানুষ সুখ ভোগ করুক না কেন এরপরেও আরো একটি জগত রয়েছে। ইসলামিক বক্তা জাকির নায়েক বলেন সেটাই হলো প্রকৃত জগত তাই এই জগতের সুখ ভোগ ক্ষণস্থায়ী। সেই জগতে অপরাজিত, অপরিমাণ সুখ ও সুন্দরী নারীদের কামময় ভালবাসা ভোগ বাসনা রয়েছে যা চিরস্থায়ী।  সেই জগতের সুখ ভোগই হলো প্রকৃত এবং স্থায়ী । তার জন্যই তৈরি হওয়া উচিত যদিও এটা বাস্তবতা বিরোধী কারণ এই জগতে আমি কষ্ট করেই যাব শুধু এক অলীক কল্পনায় বিশ্বাসে? 

অর্থাৎ আজকে আমি কষ্ট পেতে চাই আগামীকাল সুখ ভোগের আশায় কিন্তু সেই আগামীকালের সুখ ভোগ আদেও কি আসবে জীবনে তা কেউ জানে না সবাই বিশ্বাস করে যে আগামীকালের সুখ ভোগ আসবে আর এর জন্যই জীবন ভর নিজেকে পার্থিব সমস্ত সুখভোগ থেকে বিরত রাখে?  

একবার আমি ভারতের ব্যাঙ্গালোর বেড়াতে গেলাম সেখানে দেখলাম হিন্দু দেবতা গণেশ সেখানে মুখ্য দেবতা হিসেবে পূজিত। সর্বত্রই গণেশ দেবতার পূজা অর্চনা ও বন্দনা।  আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এখানে গণেশ কে আমরা গৌণ দেবতা হিসেবে গণ্য করি কারণ দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার দুই সন্তানের জ্যেষ্ঠ সন্তান অর্থাৎ দেবতাদের সন্তানাদি দেবীর সন্তান। ভারতের ব্যাঙ্গালোরে চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। ঠিক একইভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমরা যতটা না সম্মান ও শ্রদ্ধা করি ভারতের সর্বত্রই কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের এই আধিপত্য মানুষের ধর্মচর্চার জগতে খুব বেশি দৃশ্যমান হয় না। ভারতের কোথাও কোথাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নামই শোনা যায় না। একজন হিন্দু হিসেবে ভারতে যখন ঘুরতে যাই তখন কোথাও কোথাও নিজেকে অপরিচিত মনে হয় কারণ একই ধরনের ধর্মীয় কালচার দেখা যায় না। এই কারণেই আসলে এটা স্থান বা পাত্র ভেদে চেঞ্জ হয়ে যায় এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও এই ধরনের বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়। এটা একটি প্রথা বা সংস্কৃতির অংশ যা দীর্ঘদিন ধরে পালিত হয়ে আসছে।

জাপানিজদের মধ্যে ধর্মচর্চার খুব বেশি প্রচলন দেখা যায় না। জাপানের একটি ধর্ম রয়েছে তার নাম শিন্থ। মন্দির ভিত্তিক ধর্ম। মূলত এটি একটি প্রকৃতি প্রেম। জাপানিরা প্রকৃতিকে গড বলে মনে করে তাই এই ধরনের ধর্মবিশ্বাসের সমস্ত মন্দিরগুলো পাহাড়ের উপরে অথবা গহীন জঙ্গলের মধ্যে দেখা যায়। হিন্দু বা ইসলাম ধর্মের মত ধর্মীয় স্থাপনা গুলো যেমন মন্দির  বা মসজিদগুলো কোন টাই একেবারেই গহীন জঙ্গলের ভিতরে অথবা সুউচ্চ পাহাড়ের উপরে তৈরি করা হয়না । 

আমি একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম জাপানের দক্ষিণ প্রদেশের দিকে মিয়াজাকির  কাছাকাছি। একটি পাহাড়ের উপরে উঠেছিলাম। সেই পাহাড়ে একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এক দশক আগে সেই আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাতে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে জনপদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল আর তখনই প্রকৃতি দেবতার গুরুত্ব বেড়ে যায়। আরো বেশি গুরুত্ব সহকারে তাকে পূজা করা হয়। প্রকৃতি রুষ্ট হলেই তখন এই ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে বলে তারা বিশ্বাস করে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে প্রকৃতি দেবতা এখন আরও বেশি সক্রিয় এবং শক্তিশালী এজন্য সবাই তাকে ভয় করে এবং পূজা করে। ধর্ম আসলে ভয় থেকেই সৃষ্টি। মানুষ ভয় করে বলেই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে।

পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যখন আমি একটি নতুন আবিষ্কার উপস্থাপন করলাম। আমার গবেষণায় একটি নতুন প্রাগৈতিহাসিক ঘটনা উপস্থাপন করলাম যা  বিজ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। আমি একটি ইতিহাস পুনরুদ্ধার করেছি যা ২৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ঘটেছিল যার ফলশ্রুতিতে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গাছপালা ধ্বংস হয় আর আগুন লাগার মতো ঘটনা ঘটে এবং সমস্ত গাছপালা পুড়ে যায়। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে অথবা অন্য কোন কারণে এই বনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে এর ফলে স্থলভাগের জীবকুল এবং সামুদ্রিক প্রাণী গুলো ধ্বংসের উপক্রম হয়। ২৫ কোটি বছর আগে এক মহাবিলুপ্তি ঘটনা ঘটে আমার এই আবিষ্কার সেই ঘটনাকে সাক্ষ্য দেয়।

২৫ কোটি বছর আগের এসব ঘটনা যখন আমরা পুনরুদ্ধার করতে যাই তখন আধুনিক সভ্যতা এবং প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা একেবারেই মামুলি ব্যাপার মনে হয় কারণ অতি অল্প সময়ের ঘটনা। ভূতাত্বিক সময়ের তুলনায় ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র, যেখানে ২৫ কোটি বছর আগের ঘটনা সেখানে মাত্র 10 হাজার বছর আগের মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা!

বেদ কিভাবে সৃষ্টি হল?

পৃথিবীর ইতিহাস পড়াশোনা বাদ দিয়ে যখন আমি মনুষ্য সভ্যতার উত্থান এবং এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম তখন দেখলাম যে আমাদের হিন্দু ধর্মের উত্থান হয়েছিল আর্যদের দ্বারা বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু নদের তীরে। আর্যরা বসবাস করত মূলত আরো উত্তর কাজাকিস্তান, তুর্কমেনি ওই স্থানে। ওখান থেকে এরপরে একদল মিশরের দিকে, একদল মঙ্গোলিয়ার দিকে, একদল ভারতের দক্ষিণ দিকে এবং একদল হিমালয় পাদদেশ সংলগ্ন উত্তর ভারতের দিকে অবস্থান নেয়। এভাবেই  আর্যরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে তাদের রচিত গ্রন্থ বেদ হল হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থ। বেদ পাঠ করলে অবশ্য তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। সেই বেদ ঋষিদের তারা লিখিত। প্রথম দিকে যদিও বেদ মুখে মুখে প্রচলিত ছিল এজন্য শ্রুতি শাস্ত্রও বলা হয়। স্মৃতি থেকে উত্থিত। তবে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভুলে যাওয়ার দোষ নিয়ে জন্ম নেয়। এজন্য বেদের শুক্ত গুলো যাতে ভুলে না যায় এজন্য মুখস্ত করার একটি কৌশল পদ্ধতি রয়েছে। অর্থাৎ একটি শব্দকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বারবার উচ্চারণ করে সূক্ত গুলোকে মুখস্ত রাখা হতো। একটি বাক্যে যদি পাঁচটি শব্দ থাকে পাঁচটি শব্দকে বিন্যস্ত করে বিভিন্নভাবে এগুলোকে মুখস্ত করতে হতো এর অনেকগুলো নিয়ম ছিল। শব্দগুলোকে পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হতে হবে পূর্বের উচ্চারিত শব্দকে সাথে নিয়ে অর্থাৎ ব্যাক এন্ড ফোর্থ স্টাইলে।

আমরা একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যাবে। “আমি তোমাকে ভালোবাসি” এই বাক্যটি যদি আমরা বেদের ব্যবহৃত শ্রুতি শাস্ত্রের পদ্ধতি ফলো করি তাহলে বলতে হবে [আমি তোমাকে], [তোমাকে ভালোবাসি], এভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এটার নিয়ম হলো [এক দুই], [দুই তিন]। এভাবে অগ্রসরমান হতে থাকবে যাতে প্রতিটি বাক্যের শব্দগুলো কখনোই পরিবর্তন না হয়ে যায়। বাক্যের মধ্যে শব্দগুলো যাতে ঠিকমত থাকে। এভাবে বেদের মন্ত্র গুলো শিষ্যদের দ্বারা পঠিত হতো এবং মনে রাখতো প্রজন্মের পর প্রজন্ম।এরপর কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব এটাকে গ্রন্থ আকারে লিপিবদ্ধ করেন। উনাকে বলা হত বেদব্যাস । কারণ তৎকালীন ধর্মগ্রন্থ বেদ এর মন্ত্র গুলো এত বেশি বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ছিটানো ছিল যে সেগুলোকে ক্যাটাগরি অনুসারে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে শ্রেণিবদ্ধ করা একটি চ্যালেঞ্জ এবং সেই কাজটি করেছিলেন ব্যাসদেব এজন্যই তার নাম বেদব্যাস কারণ তিনি বেদকে বিন্যস্ত করেছেন এবং সাজিয়েছেন চারটি শ্রেণীতে  রিখবেদ, সাম বেদ, যদুরবেদ ও অথর্ব বেদ। সমস্ত সূক্ত গুলিকে নিয়ে এটা একটি কঠিন কাজ ছিল। 

বেদের আদি শ্লোক গুলো কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির রচিত নয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মুনি ঋষিরা এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন এবং মুখে মুখে এগুলো হাজার বছর ধরে প্রচলিত ছিল সেই সমস্ত সুক্ত গুলোকে ব্যাসদেব একীভূত করেছেন। বেদ সামগ্রিকভাবেই তৎকালীন ঋষিদের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ধ্যান মগ্ন জ্ঞান গর্ভ থেকে উত্থিত জ্ঞান। এই গ্রন্থ কোন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি রচনা করেননি অথবা ঐশ্বরিক কোন কিছু নয় যে মন্ত্র গুলো ব্যসদেবের নিকট কোন এক মধু রাতে আকাশ থেকে বৃষ্টির ধারার মত তার হৃদয়ে প্রবেশ করেছে এবং তিনি লিখতে বসলেন আর লিখে ফেললেন! এটা মূলত হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন ঋষিদের দর্শন এর সমন্বয়। ঋষি শব্দটা নিয়ে আমরা অতি মাত্রায় ভক্তি বা অতি উচ্চ স্তরে আসন করেছি। আসলে ঋষিরা ছিল জ্ঞানী তারা জ্ঞান সৃষ্টিকারী। তারা ঐশ্বরিক কেউ নয় আমাদের মতই সাধারণ মানুষ।এখন এই দর্শন কতটুকু গ্রহণযোগ্য বর্তমান যুগে এসে সেটা প্রতিটি ব্যক্তি বিশেষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কোন একটি দর্শন আমি গ্রহণ করব কি করব না সেটা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির ইচ্ছা স্বাধীন। যেমন ভারতের কিছু সন্ন্যাসী মনে করে যে পাথরেরও জীবন রয়েছে, এটা একেবারেই অমূলক বর্তমান যুগে এসে। গাছেরও প্রাণ রয়েছে এটা আবিষ্কার করেন স্যার জগদীশচন্দ্র বসু। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ও বিশ্বাস করতেন যে পাথরের প্রাণ রয়েছে। যাই হোক এটা ব্যাক্তিগত বিশ্বাস।

বিজ্ঞান সেই বিশ্বাসকেই প্রমাণ করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। যদি সেই বিশ্বাস প্রমাণ করা যায় তবে তা আমাদের গ্রহণ করতে কোন বাঁধা নাই। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মই একটি বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেলেই ধর্মের অনুভূতি থাকে না। কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম রয়েছে যারা মানুষের মনে সৃষ্টি করে ভয়। ভয় সৃষ্টি করে, জোর করে বিশ্বাস করাতে চায়। আবার কিছু ধর্ম রয়েছে যারা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে দেব-দেবী উপাসনা করার ক্ষেত্রে, ভূত প্রেত উপাসনা করার ক্ষেত্রে অথবা অন্য কিছুতে উপাসনা করার ক্ষেত্রে। যে ধর্মের দর্শন যত বেশি উদার যত বেশি সহনশীল সে ধর্মই তত দিন ধরে মানুষের মনে আশ্রয় করে থাকে। হিন্দু ধর্মের স্থায়িত্ব সব থেকে বেশি কারণ এই ধর্মের বিভিন্ন দর্শন রয়েছে যে দর্শন গুলো একজন মানুষ  ইচ্ছা করলে গ্রহণ করতে পারবে অথবা পরিত্যাগ করবে কেউ বাঁধা দিবে না । হিন্দু ধর্মে নাস্তিক হলেও কেউ তাকে সমাজ চুত্য করে না । এটাই হিন্দু ধর্মের উদারতা। কিন্তু অন্যান্য ধর্মে আপনি নাস্তিক হয়ে একি সমাজে বসবাস করতে পারবেন না। আপনাকে সমাজ চুত্য করবেই, অথবা কতল করবে। হিন্দু ধর্মে কেউ স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন, কেউ চৈতন্য মহাপ্রভুর দর্শন, কেউ বা কালি ভক্ত, কেউ শ্রীকৃষ্ণ ভক্ত, কেউবা হনুমান ভক্ত আবার কেউ গণেশের উপাসক এটা মূলত দর্শনের ভিন্নতার কারণেই। তবে ধর্ম আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। ধর্মের দর্শন গুলো যে গুলো মানবিক সেগুলো গ্রহণ করা যায়। ধর্মের শিক্ষাগুলো মানুষ হিসেবে আমাদের গ্রহণ করা উচিত, যেমন, মনুষত্বের ধর্ম। মানুষের ধর্ম, মনুষ্যত্ব ধর্ম এটা অর্জন করতে হয়। কোন একটা মানুষ জন্মগ্রহণ করেই মনুষ্যত্ব ধর্ম অর্জন করে না তাকে অর্জন করে নিতে হয়। শিখতে হয় কি কি গুন থাকলে মনুষ্যত্ব অর্জন করা যায়। ঋষিরা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে গিয়েছে তাই ধর্মের দর্শন গুলোকে আমরা নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতে পারি যেগুলো আমাদের জন্য ভালো ও কল্যাণকর।  কাল্পনিক অবাস্তব দর্শন পরিত্যাগ করা উচিত।

 

হিন্দু ধর্ম দর্শনভিত্তিক ধর্ম। এজন্যই হিন্দু ধর্মে যত মত তত পথ রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের এই কথাটি প্রযোজ্য।  কারণ এখানে সময়ের সময়ে মুনি-ঋষিরা তাদের দার্শনিক তত্ত্ব সংযোজিত করেছেন। তাই হাজার বছর ধরে হিন্দু ধর্মের এত দার্শনিক তত্ত্বের উত্থান। হিন্দু ধর্মে যত দার্শনিক তত্ত্ব কথা রয়েছে পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মে এত তত্ত্ব নেই। হিন্দু ধর্মের কিছু মূল দর্শন যেমন জন্মান্তরবাদ। আত্মা অবিনশ্বর, অখন্ডতা তত্ত্ব। ঈশ্বর নিরাকার বা সাকার তত্ত্ব। জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর স্বামী বিবেকানন্দের এটাও একটি দর্শন। এ দর্শন আমাদের হিন্দু ধর্মে সংযোজিত হয়েছে এবং আমরা বিশ্বাস করি। জীব কুল কে ভালবাসলে ঈশ্বরকে ভালোবাসা হয়। আসলে এটা একটি কাল্পনিক তত্ত্ব যদিও দর্শন সর্বদাই কাল্পনিক হয়ে থাকে। দর্শন বাস্তবে প্রমাণ করা সম্ভব হয় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দর্শনকে ভালোবাসি স্বামী বিবেকানন্দের এই তত্ত্বকে আমি ধারণ করেছি কারণ এখানে আমার ঈশ্বর লাভ হবে এই উদ্দেশ্যে নয়, আমি এটাকে ভালোবাসি মানুষ হিসেবে যেকোনো প্রাণীকুলকে সম্মান করা উচিত। হিংসা না করাই উচিত তাহলে মনুষত্ব ও পশুর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। যেহেতু আমরা মানুষ তাই আমাদের মনুষ্যত্ব গুণ অর্জন করতে হয় এই মনুষ্যত্ব অর্জন করতে গেলে আমাদের অনেকগুলো গুণের অধিকারী হতে হয় তার মধ্যে একটি হলো অহিংসা।

আমরা যখন নিজেদেরকে অহিংস করতে পারব তাহলে আমরা মনুষ্যত্ব অর্জনের প্রথম ধাপ অর্জিত হবে তাই স্বামী বিবেকানন্দের জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর এই কথাটি অহিংস ধর্ম। মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য এই দর্শন হিন্দু ধর্মকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। হিন্দু ধর্ম এমন শত শত গ্রহণযোগ্য দার্শনিক তত্ত্বের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত। আমি এই দর্শনকে সাপোর্ট করি। তবে সব দর্শন যে প্রতিষ্ঠা পাবে ঠিক তেমনটি নয়।  কারণ স্বামী বিবেকানন্দই আত্মা সম্বন্ধে যে দার্শনিক তত্ত্ব দিয়েছেম তা পরিত্যাজ্য। আমি গ্রহণ করিনি। আত্মা সম্বন্ধে তার বক্তব্য হাস্যকর। হাজার বছর ধরে অনেক মুনি ঋষি প্রতিনিয়ত জীবনের উদ্দেশ্য যেমন আমি কে? কি আমার উদ্দেশ্য? আমি কোথা থেকে এলাম? কোথায় ফিরে যাব? এমন কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রতিনিয়তই খুঁজে চলেছেন আর তখনই তারা নতুন নতুন দার্শনিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন সমাজে। সব দার্শনিক তত্ত্ব যে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবে ঠিক তেমনটি নয়। উত্তর ভারতে শিখ সম্প্রদায় মনে করে যে পাথরের জীবন রয়েছে কিন্তু এই তথ্য আমি মেনে নিতে পারি না। উত্তর ভারতের অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এটাকে বিশ্বাস করে যদিও ধর্ম সর্বদাই বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত । এই বিশ্বাসের উপরে যদি দার্শনিক তত্ত্বটা সুদৃঢ  হয় এবং গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে সেই দার্শনিক তত্ত্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং হাজার বছর ধরে মানুষ মেনে চলে এবং সেই দর্শনকে মানুষ  বাঁচিয়ে রাখে। যেমন হিন্দু ধর্মের জন্মান্তরবাদ তত্ত্ব ।

 

সেই দর্শনকেই আমি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি যা পৃথিবীর জন্য যা কল্যাণকর, মানুষের জন্য যা মঙ্গলকর,পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুলের জন্য  যা অহিংস, উদ্ভিদের জন্য যা নিধনকারী নয় এবং প্রকৃতির জন্য সহায়ক। নির্বিচারে পশু নিধন করা যেমন কিছু ধর্মের বিধান হিসাবে মানুষ পালন করে আবার পশু নিধন রোধ করতেও কিছু ধর্ম বিধান দিয়েছে। নির্বিচারে পশু নিধন করা দর্শন আমি মেনে নিতে পারি না এটা হিংসা তাই আমার কাছে পশু নিধন কোন ধার্মিক লোকের কাজ হতে পারে না। মনুষ্যত্ব গুণ সম্পন্ন কোন মানুষের কাজ হতে পারে না। যারা অমানুষ পাশবিক তারাই পশু নিধন করে এই দর্শন আমার কাছে পরিত্যাজ্য ।