গোধূলি সন্ধ্যা

দীপা রায়
————–
ঘড়িতে সকাল ৭.৩০ মিনিট। এলার্ম বেজে উঠল ক্রিং ক্রিং ক্রিং। ইস! আমার সাধের ঘুমের শত্রুটাকে কে যে অন করে রাখছে! ধুর ভাল্লাগেনা, আর একটু ঘুমাই।
-রীদি, এই রীদি ঘুম থেকে উঠবি না? অনেক বেলা হয়ে গেছে তো। তোর না আজ কলেজে প্রোগাম আছে।
-উফ! মা, আর একটু ঘুমাই।
-৮ টা কিন্তু বাজে পরে আমাকে দোষ দিতে পারবি না যে আমি ডাকি নাই।
-ইস, মা আর একটু আগে ডাকতে পারলা না?
-আমি যে তোর ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম, তুই তো আগের মতোই, বন্ধ করে আবার ঘুমাইছিস।
-উফ! মা, উঠতেছি। সকাল সকাল তোমার বিবিসি চালু করো না তো।
-আমি ভাল কথা বললেই দোষ, যা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।
-যাচ্ছি তো।

 

এ হচ্ছে রীদিকা। যার প্রিয় কাজ হচ্ছে ঘুমানো। আর সব থেকে প্রিয় ব্যাক্তি তার মা। কারন তার মা ছাড়া আর কেউ নেই এই ভুবনে। তার মা এস আর ত্বাহা। সে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। তা দিয়ে তাদের মা-মেয়ের চলে যায়। আর রীদিকা এবার সম্মান শ্রেণীর প্রথম বর্ষে পড়ে।

-মা, চুল টা জট লেগেছে ছাড়িয়ে দাও না।
-এতো বড় একটা মেয়ে এখনো নিজের কাজ নিজে করতে জানে না।
-আমার কাজ গুলো তুমি না করলে কে করবে শুনি?বসারাদিন তো অফিসে থাকো। বাড়িতে যে একটা মা আছে তার সেবা যত্ন করতে হবে না? এভাবে বসে থাকলে তো আরও গুলু মুলু হবে।
-ওরে দুষ্ট মেয়ে।

রীদিকার কলেজে আজ নবীন বরণ অনুষ্ঠান আছে। তাই তৈরি হয়ে তাড়াতাড়ি কলেজে যাওয়ার জন্য বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় মনে পড়ল তার বাবাকে তো দেখানো হলো না, সে কত সুন্দর করে সেজেছে। তাই ঘুরে এসে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল-বাবা, দেখো তোমার রাজকন্যা কিভাবে সেজেছে। আর বলতো কে বেশি সুন্দর আমি না মা? নিশ্চয়ই আমি তাই না বাবা?
এসব দেখে ত্বাহা ইসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কলেজ থেকে ফিরে রীদিকা মায়ের জন্য খাবার বানিয়ে অপেক্ষা করে কখন তার মা আসবে। কিন্তু সে জানে তার মা আজকে বাড়ি ফিরবে না। কারন কালকে যে ১৩ই আগস্ট। এই দিনের আগের দিন মা বাড়ি ফিরে না। একদম ১৪ তারিখ বাড়ি আসে। এই রহস্য তার অজানাই আছে এখনো। এতোদিন অনেক চেষ্টা করে তা জানতে পারে নাই। না জানতে পেরেছে তার বাবার কিভাবে মৃত্যু হয়েছে। সে জন্মের পর থেকেই তার বাবাকে ছবিতে দেখে আসছে শুধু। সবার বাবা আছে, দাদু-দাদি, চাচা-চাচি, ভাই-বোন আছে। কিন্তু তার কেউ নেই কেন? যতবার জানতে চেয়েছে তার মা ততোবার নানারকম কথা বলে এড়িয়ে গেছে বিষয়টা। তার আরও অনেক কিছু অজানাই রয়ে গেছে। যেমন- তার মা প্রতিরাতে কাকে যেন ফোন করে তারপর কান্না করে।

১৩ই আগস্ট সকাল এ মানসিক হাসপাতাল এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্বাহা। ভয়ে ভয়ে হাসপাতাল এর ভিতরে ঢুকে ২০৪ নাম্বার রুমের রোগীর কাছে গেলো। তিনি রোগীকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে কাঁধে কারো ছোঁয়া পেয়ে পিছনে তাকায়। দেখতে পায় সেখানে আর কেউ নয় তার মেয়ে রীদি দাঁড়িয়ে। ত্বাহা ইসলাম ভয়ে কাঁপতেছেন কারণ আর সত্য গোপন রইল না। অন্যদিকে রোগীটি রুমের চেয়ার উঠিয়েছে রীদিকে মারার জন্য। সাথে সাথে ত্বাহা ধরে ফেলে আর ডাক্তারকে ডাকে। রীদিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে সাথে সাথে। রাস্তায় কেউ কারো সাথে কোন কথা বলে নি।

অতীতে রীদিকা জানতো যে, তার মা এইদিন বাইরে যাবেই তাই সে আগে থেকেই তার বান্ধবীকে বলে মায়ের ফোন এর লোকেশন চেক করার জন্য। সেই লোকেশন চেক করেই আজ সকাল এ মানসিক হাসপাতালে পৌঁছায়। আর অবাক হয়ে যায় তার মা এখানে কি করে। তার থেকে বেশি অবাক হয় যখন দেখে তার মা একটা লোককে খাবার খাওয়াচ্ছে তা আর কেউ নয় এতোদিন যাকে বাবা ভেবে এসেছে। আর সে জানে হয়তো বাবা মারা গেছে। কিন্ত আজ দেখতেছে তার বাবা জীবিত, আবার তার বাবা একজন পাগল। রীদিকার মনে নানা প্রশ্ন জাগতেছে, বাবা পাগল হোক আর যাই হোক তার মা কেনো তার থেকে লুকিয়েছে। কেন তাকে এতোদিন জানায় নি। এসব ভাবতেছিল রীদিকা।
-নামো, আমরা বাড়ি পৌছে গিয়েছি।
তার মায়ের কথায় কল্পনার জগত থেকে ফিরে আসে।
বাড়িতে আসার পর রীদিকা তার মা কে কিছু বলার আগেই তার মা বলল
-আমি জানি তুই কি বলতে চাস, আমি এখন অনেক ক্লান্ত। ঘরে যাচ্ছি। কিছু সময় পর কফি নিয়ে বেলকনিতে অপেক্ষা কর আমি আসতেছি।
বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, মা-মেয়ে দুজনে কফি খাচ্ছে বাইরের দিকে তাকিয়ে। কেউ কোন কথা বলছেনা। আগের দিন হলে এতক্ষণ দুজনে খুনসুটিতে মেতে উঠত। কিন্তু আজ দুজনে নিঃশ্চুপ। প্রথমে ত্বাহা ইসলাম শুরু করলেন।
-তোর বাবার সাথে যেদিন দেখা হয়েছিল প্রথম সেদিন ও বৃষ্টি ছিল। দিনটা ছিল ১৩ই আগস্ট। আমি তখন একাদশ শ্রেণীতে পড়তাম। কলেজ হোস্টলে থাকতাম। কলেজে কমপক্ষে ৩০০ ছাত্র ছাত্রী ছিল। কেউ কাউকে ভাল করে চিনতাম না। যে কয়েকজন এর সাথে প্রাইভেট পড়তাম তাদের কেও ভাল করে চিনতাম না। শুধু ১০ জন মেয়ে সার্কেল, এই হলো আমার বান্ধবী। হোস্টেল থেকে বাড়ি এসেছিলাম। যাওয়ার দিন স্টেশনে আসার পর পরই বৃষ্টি শুরু হলো। কোন রকম ছাতা নিয়ে অটো খুঁজছিলাম। একটা অটো ডাকল, জায়গা আছে আসুন। আমি মনে করলাম অটোর ভিতরে কেউ নেই। তাই ধুপ করে অটোতে বসলাম। একজন এর চিৎকার শুনে পাশে তাকিয়ে দেখি একটা ছেলে বসে আছে আর আমি তার পা তে পারা দিয়ে বসেছি। তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। আর না দেখে বসার জন্য ক্ষমা চাইলাম। অটো চলা শুরু করল। কিছু সময় পর ছেলেটা বলল,
-আপু কোথায় যাবেন আপনি?
-আমি সরকারি কলেজের গেটে নামব।
-আমি ও তো ওখান এ নামব। কোন ক্লাস এ পড়েন আপু?
-একাদশ শ্রেণিতে। আপনি?
-আমিও, বিজ্ঞান বিভাগে আমি।
-আমিও।
-কই আপনাকে তো কখনো দেখি নাই ক্লাস এ?
-এতো ছাত্র ছাত্রী এর মাঝে কে কাকে মনে রাখবে।
এভাবেই পরিচয় জানলাম। তোর বাবার নাম ছিল এস আর মৃন্ময় ইসলাম। পরের দিন দেখি তোর বাবাকে আমি যে যে প্রাইভেট পড়ি সেই জায়গাতে। অথচ দুমাস এর ও বেশি সময় প্রাইভেট পড়ি কিন্তু কেউ কাউকে চিনি না। ওইদিন ক্লাস এ তোর বাবা আমার কাছে এসে বলল,
-কিছু মনে না করলে তোমার পদার্থ খাতাটা দেওয়া যাবে? কিছু অনুশীলনী এর কাজ করতে পারি নাই তো।
-কেন নয়। এই নাও খাতা।
সেদিন একে অপরের মোবাইল নাম্বার ও নিলাম। সেদিন থেকে একে অপরের নোট খাতা নেওয়া, কলেজে কথা বলা, দিনে ফোন দিয়ে খোজ নেওয়া। এভাবেই দুজনের মাঝে ভাল বন্ধুত্ব তৈরি হল। আমাদের সম্পর্ক তুমি থেকে তুইতে চলে এলো। ফোন করে খোঁজখবর নেওয়া, কে কতবার ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে পারি, কে কার আগে ঘুম থেকে উঠে প্রথম ফোন দিতে পারি এসব এর প্রতিযোগিতা চলছিল, সাথে পড়াশোনারও। এভাবেই আমাদের ইয়ার চেঞ্জ হয়ে গেল। মৃন্ময় চাইতো না আমি অন্য কোন ছেলের সাথে কথা বলি। কথা বললে রাগ দেখাতো। নোট খাতা চাইলে বলতো যে ছেলেটার সাথে কথা বললি ওর কাছে নে। আমি দিবো না খাতা। তখন বুঝতাম আসল ঘটনা কি। এভাবেই চলছিলো দুজনের বন্ধুত্ব। একদিন মৃন্ময় ফোন দিয়ে বলল,
-দোকানে গিয়ে ৫০০টাকা বিকাশ করে দে তো।
-এতো টাকা কি করবি তুই?
-বেশি বকবক না করে যা বললাম কর, তাড়াতাড়ি।
আমি দোকানে গিয়ে টাকা দিলাম। ওর রুমমেটকে ফোন দিয়ে বললাম যে মৃন্ময় কোথায়। ওর রুমমেট বলল দুজনে আমরা বড় বাজার এ আসছি। আমি তোকে একটা মেসেজ দিচ্ছি দেখ। মেসেজটা দেখার পর প্রচুর হাসলাম। মেসেজ এরকম ছিলো যে তোর বাবা কোন মেয়ের সাথে দেখা করতে গেছে আর সে সব টাকার কাপড় কিনেছে, রেস্টুরেন্টের খাবারের বিল দিতে গিয়ে দেখে মানিব্যাগ ফাঁকা। বাধ্য হয়ে আমাকে ফোন দেয়। তোর বাবা এর কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক বেশি দিন যাইতো না। টেস্ট পরিক্ষার পর আমি একদিন তোর বাবার সাথে ডাক্তার দেখাইতে যাই। মৃন্ময় আমার টেস্টের রিপোর্ট আনতে যায় আর ওর ফোনটা আমার কাছে ফেলে যায়। তখন একটা মেসেজ আসে। বুঝলাম যে আবার নতুন কোন মেয়ে পটাচ্ছে। তা দেখে হাসলাম। ডাক্তারের ওখান থেকে আসার সময় বললাম
-নতুন মেয়েটা কে?
-বলল তুই চিনবি। তোকে বলা যাবে না। তুই ব্রেকাপ করায় দিবি।
আমি তখন কিছু বললাম না। কিন্তু নাম্বারটা মনে রেখেছি। হোস্টেলে এসে নাম্বারে ফোন দিয়ে দেখি আমার এক বান্ধবী বৃষ্টি। যারও কিনা তোর বাবার মতো অনেক ছেলের সাথে সম্পর্ক। ঠিক দুইদিন পর তোর বাবা বলতেছে,
-আমি মনে হয় ফাইনাল পরিক্ষা দিবো না।
-কেনো দিবি না? তুই তো আমার থেকেও ভাল ছাত্র।
-পড়াশোনা করি না রে সারাদিন ওর সাথে (বৃষ্টি ) কথা বলতেই যায়।
এটা বলার পরপরই আমার সামনে সিগারেট ধরাল। যে ছেলে এতোদিন সিগারেট খেলে আমার সামনে আসার আগে ব্রাশ করে আর আজ আমার সামনে সিগারেট ধরাল। মাথা খারাপ হয়ে গেল। তখন ওকে কিছু না বলে হোস্টেল এ চলে আসলাম। ওর ভাই আর আপুর মোবাইল নাম্বার আমার কাছে ছিল। ফোন করে সব বলে দিলাম। আর এও বললাম কাল সকালেই যেন বাড়ি নিয়ে যায়। কারন টেস্টের পর প্রাইভেট সেরকম করার দরকার নেই। ওকে যেনো ভাইয়া নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখে। পরের দিন সকাল এ ফোন দিয়ে মৃন্ময় দেখা করতে বলল। বলল যে আমি বাড়ি যাচ্ছি। ওকে বললাম ভাল করে পরলে হোস্টেলএ থাকতে পারতি৷ এখন বুঝ কেমন লাগে। মৃন্ময় বুঝে গেল সব কারসাজি আমার। তখন কিছু না বলে চলে গেল। বাড়িতে যাবার পর নতুন সিম কিনল। সব মানলো ওর আপু যা যা বলল, কিন্তু সে ভাইয়ার কাছে গিয়ে থাকবে না। ভাইয়া ফোন দিলো আমাকে ওকে বুঝানোর জন্য। কিন্তু সে আমার ফোন ধরে না। আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো কথা বলতে না পেরে। না পড়াশোনা করতে পারতেছি, না ঘুমাতে, না খাইতে। মৃন্ময় কে ছাড়া আমার জীবনটায় অচল হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম আমি ওকে বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু ভাবি। প্রতিদিন মেসেজ এর উপর মেসেজ, ফোন দেওয়া শুরু করলাম। একসপ্তাহ পর ফোন ধরল। কিন্তুু খাপ ছাড়া কথা বলা শুরু করল। ওকে বললাম,
-তুই ভাল করে কথা বলছিস না কেন?
-কই ভাল করে বলছি তো।
-তুই নাকি ভাইয়ার কাছে যাবি না, বাড়িতেও পড়াশোনা করতেছিস না। তুই আসলে কি করতে চাচ্ছিস বলতো?
-পড়াশোনা আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিবো।
আবার মাথা খারাপ হয়ে গেল সারাদিন বুঝানোর পর এটা সিদ্ধান্ত নিলো যে, ওকে যেভাবে বাড়ি পাঠাইছি সেভাবে যদি আবার হোস্টেলে নিয়ে যেতে পারি তাহলে পড়াশোনা করবে। না হলে নাই। আমি অনেক কষ্টে ওর বাড়িতে রাজি করালাম আর ওর দায়দায়িত্ব নিজে নিলাম। তখন পরের দিন হোস্টেলএ চলে আসল। আর আমার দেহে মনে হল প্রাণ ফিরে আসল। আবার আগের মতোই হয়ে গেলাম। বন্ধুত্ব এর কাছে আমার ভালবাসাটা ঢাকা পরল। মনকে বললাম ও তো আমারই আছে। চলুক না বাকি দিন গুলো। কেন ভালবাসি কথাটা বলে বন্ধুত্বটা নষ্ট করি। ওর মনের অগোচরে ওকে একটু একটু করে ভালবাসতে শুরু করলাম। এভাবেই এইসএসসি শেষ হলো। দুজনে দু’প্রান্তে চলে গেলাম ভর্তি পরিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। দুরে থাকলেও মনের মাঝে শুধু তারই বাস ছিল। দুজনে ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। সাথে যতদিন যাচ্ছে মৃন্ময় আমার থেকে দূরে যাচ্ছে। সে প্রতিনিয়ত আর ও বেশি মেয়েদের সাথে মিশতে লাগল আমার খোঁজ নেওয়া বন্ধ করল। আমি ফোন করলেও দায়সারা ভাবে কথা বলতো। তাই ভালবাসাটা নিজের মনেই কবর দিয়ে দিলাম। ওকে কখনো বলে উঠতে পারি নাই কতোটা ভালবাসি আমি। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করলাম। একদিন মৃন্ময় এর আপু ফোন দিলো। আমি বিস্ময় নিয়ে মোবাইলটার দিকে তাকালাম আসলে আপু কি না। দ্বিধা নিয়ে ফোন ধরলাম। আপুর গলা ভাঙ্গা, মনে হচ্ছে অনেক কষ্টে কথা বলতেছে। আমাকে বলল যেখানে থাকিস না কেন আমাদের বাড়ি চলে আয়। আমি বললাম কি হয়েছে আপু? আপু শুধু বলল যে বাড়ি আসলে সব জানতে পারবি। আমি অনেক উৎকন্ঠা নিয়ে পৌঁছালাম। গিয়ে দেখলাম মৃন্ময় নেশায় বুদ হয়ে আছে আর একটা বাচ্চাকে আছাড় মারার চেষ্টা করতেছে কেউ আটকাতে পারছে না। আমি দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে কেড়ে নিলাম। দেখতেছি ছোট একটা পরী সুন্দর করে ঘুমিয়ে আছে। তারপর আপুকে বললাম মৃন্ময় এর এই অবস্হা কেনো? আর এই বাচ্চাটা কার? আপুর কাছে জানতে পারলাম মৃন্ময় ২ বছর আগেই বিয়ে করেছে। আর এই বাচ্চাটা মৃন্ময় এর। এটা শোনার পর পুরনো ব্যাথাটা আবার শুরু হল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললাম তাহলে মৃন্ময় এর বউ কোথায় আর ওরই এই অবস্থা কেনো? এরপরে যেটা শুনলাম সেটার জন্য মোটেই প্রস্তুুত ছিলাম না। মৃন্ময় এর বউ নাকি অন্য পুরুষদের সাথে মিশত। তাই মৃন্ময় বাচ্চা নিতে বলল। যাতে সে সঠিক পথে আসে। অনেক ঝগড়ার পর বাচ্চা নিলেও তার আচার আচরণে পরিবর্তন আসল না। মৃন্ময় ভাবল মা হওয়ার পর সব স্বাভাবীক হবে। কিন্তুু যেদিন বাচ্চা হল ঠিক তারপরের দিনেই একটা চিঠি লিখে বাচ্চাটাকে ছেড়ে মৃন্ময় এর এক বন্ধু এর সাথে পালিয়ে যায়। যার কারনে মৃন্ময় এখন নেশা করে। বাড়ির মানুষ অথৈ সাগরে পড়ে গেল। ছোট একটা
বাচ্চাকে কে সামলাবে আবার একদিকে মৃন্ময় নেশা করে। তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিলো আবার মৃন্ময় এর বিয়ে দিবে বাচ্চাটা মাও পাবে আর মৃন্ময় ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। ছোট পরীটা তখন আমার কোলে ঘুমিয়ে ছিলো। ওর দিকে তাকিয়ে এক অজানা মায়া কাজ করল। আমি মনে মনে ভাবলাম এটায় সুযোগ নিজের ভালবাসার মানুষটাকে আপন করার। তাই সাথে সাথে আমার বাড়িতে ফোন দিয়ে মৃন্ময় এর বাড়িতে আসতে বললাম। সবাই আসার পর জানালাম আমি মৃন্ময় আর ওর বাচ্চার দায়িত্ব নিতে চাই। কিন্তুু আমার বাবা মা কোনমতে রাজি হচ্ছিলো না। তাদের এক কথা তারা একটা মাতাল তাও আবার একটা বাচ্চা আছে তার কাছে কোন ভাবেই মেয়ে দিবে না। আমি তাদের বোঝাতে চাইলাম মৃন্ময়কে আমি অনেক আগে থেকে ভালবাসি। কিন্তুু সব চেষ্টা বিফলে গেল। তখন আমি ছুটে মৃন্ময় এর কাছে গেলাম, ওর নেশা কাটিয়ে ওকে বললাম আমি তাকে ভালবাসি, আর এই ছোট পরীটার মা হতে চাই। কিন্তুু মৃন্ময় আমাকে অপমান করল। বলল সব মেয়েরা ছলনাময়ী, আর বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বলতেছে এও একদিন কারো সাথে ছলনা করবে। তারচেয়ে আমার কাছে দে, এখানেই একে মেরে ফেলি। আমি আতকে উঠে বললাম মৃন্ময় তুই পাগল হয়ে গেছিস, এতটুকু সুন্দর একটা বাচ্চাকে মারার চেষ্টা করতেছিস। মৃন্ময় কে পাবার যেটুকু আশা ছিলো তাও গেলো। রাগে দুঃখে ঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। মৃন্ময় এর আপু বলতেছে যে, যেহেতু মৃন্ময় বাচ্চাটাকে সহ্য করতে পারতেছে না একমাস ধরে আমি সামলিয়েছি আর পারব না, বাচ্চাটাকে অনাথ আশ্রমে দিয়ে আসবো। আমি অবাক এদের কথা শুনে। এরা এতটা অমানবিক কি করে হচ্ছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বাচ্চাটা আজ থেকে আমার কাছে বড় হবে যতদিন না মৃন্ময় সুস্থ জীবনে ফিরে আসছে। আমার বাবা মা তো সাথে সাথে নাকোচ করে দিল। আর মৃন্ময় এর বাড়ির লোক জানাল তারা বাচ্চার কোন দায়িত্ব নিতে পারবে না। আমি আমার বাবা মা এর সাথে বিরোধিতা করে বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে নতুন শহরে পাড়ি দিলাম। তার কয়েকমাস পর জানতে পারলাম যে মৃন্ময় নেশা করে বাইক চালানোর জন্য দূর্ঘটনা ঘটায়, যার ফলে মাথায় আঘাত পায় আর মানসিক ভারসাম্য হারায়। তখন থেকে মৃন্ময় এর স্থান হলো মানসিক হাসপাতালে। কেউ মৃন্ময় এর খোঁজ নেয় না। পারলে আমি গিয়ে একটু খোঁজ নেই। আর এতো বছরেও একটুও উন্নতি হয় নি মৃন্ময় এর। এসব বলে থামল ত্বাহা ইসলাম। এতো সময় রীদিকা চোখ বন্ধ করে এসব শুনছিলো। তার মা যখন চুপ হলো তখন সে চোখ খুলে মাকে একটায় প্রশ্ন করে,
-মা সেদিন এর সেই বাচ্চাটা বুঝি আমি?
-ত্বাহা ইসলাম ছলছল চোখে মাথা ঝাকিয়ে বুঝালো হ্যাঁ।
এটা শোনার পর রীদিকা দৌড়ে ঘরে চলে গেল। তার প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে যে এতোবছর যাকে মা বলে জানে সে আসলে তার মা নয়। তার মা তাকে জন্মের পরপরই ফেলে চলে গেছে। আর এইদিকে ত্বাহা ইসলাম দুচিন্তা করতেছে যে আবেগের বসে তো সব বলে দিল যদি তার মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে যায়। তার তো তার মেয়ে ছাড়া কেউ নেই। রীদি চলে গেলে কি নিয়ে বাঁচবে সে। এভাবেই চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে ত্বাহা ইসলাম বুঝতে পারে নি।
ভোরে তার মেয়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে।
-মা তাড়াতাড়ি উঠ, নামাজ এর সময় চলে যাচ্ছে।
ত্বাহা ইসলাম ভাবতেছেন তিনি স্বপ্ন দেখতেছেন। যে মেয়েকে ফজরের নামাজ পড়াতে পারে নাই ঘুম এর জন্য, সে আজ আমাকে ডাকতেছে। আবার ও ঘোর কাটে রীদিকার ডাকে।
-কি হল মা, কি ভাবতেছো? তাড়াতাড়ি উঠো এক সাথে নামাজ পড়ব।

মা-মেয়ে নামাজ পরে, সকালের নাস্তা বানাতে শুরু করল। সাথে আগের মতোই খুনশুটি। এভাবেই মা ও মেয়ের নতুন এক সকাল শুরু হলো।

দীপা রায়
২০১৮-২০১৯ সেশন,
ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকাশিত: ‘বর্ণালী’ মাসিক ম্যাগাজিন, অক্টোবর সংখ্যা, ২০২০

Please follow and like us:

Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

এক পলকে অভিশপ্ত

Mon Oct 5 , 2020
ফ্লোরা পারভীন তামান্না——————————–বদ্ধ ঘরে জানালার পাশে এলোমেলো চুল খুলে দাঁড়িয়ে আছি। আকাশটা অন্ধকার মেঘে ঢেকে আছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে, কিন্তু বৃষ্টির কোনো চিহ্ন নাই। যদি বৃষ্টির ছোঁয়ায় সব অভিশাপ ধুয়ে মুছে নিয়ে যেত। এইসব ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কিছুদিন আগেও আমার জীবনটা ছিলো স্বাভাবিক, […]