Nature and Man What I believe2

বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত দার্শনিক প্রবন্ধগ্রন্থ “What I Believe” (আমি যা বিশ্বাস করি): প্রথম অধ্যায়

Spread the love

বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত দার্শনিক প্রবন্ধগ্রন্থ “What I Believe” (আমি যা বিশ্বাস করি)-এর প্রথম অধ্যায়ের নাম “Nature and Man” (প্রকৃতি এবং মানুষ)。 এই অধ্যায়ে রাসেল মহাবিশ্বে মানুষের প্রকৃত অবস্থান, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানব অস্তিত্বের স্বরূপ এবং ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিশ্বাসের অসারতা নিয়ে এক আপসহীন ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ খাড়া করেছেন।

নিচে প্রথম অধ্যায়ের মূল ইংরেজি টেক্সট বা উক্তিগুলো (Quotes) সংযুক্ত করে অধ্যায়টির সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রকৃতি ও মানুষের অবিভাজ্যতা (The Indivisibility of Man and Nature)

অধ্যায়ের শুরুতেই রাসেল মানুষকে প্রকৃতির চেয়ে আলাদা বা শ্রেষ্ঠ কিছু ভাবার অহংকার চূর্ণ করে দেন। তার বিখ্যাত প্রারম্ভিক বক্তব্যটি হলো:

“Man is a part of Nature, not something contrasted with Nature. His thoughts and his bodily movements follow the same laws that describe the motions of stars and atoms.”

(অনুবাদ: মানুষ প্রকৃতিরই একটি অংশ, প্রকৃতির বিপরীত বা আলাদা কিছু নয়। নক্ষত্র এবং পরমাণুর গতি যে নিয়মগুলো মেনে চলে, মানুষের চিন্তা এবং তার শারীরিক নড়াচড়াও ঠিক একই নিয়ম মেনে চলে।)

বিস্তারিত আলোচনা:

ঐতিহ্যগত ধর্ম বা দর্শন বরাবরই দাবি করে এসেছে যে, মানুষের একটি বিশেষ ‘আত্মা’ বা ‘ঐশ্বরিক সত্তা’ আছে, যা তাকে জড় প্রকৃতি থেকে আলাদা করে। কিন্তু রাসেল এই ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করে দেন। তিনি বিজ্ঞানের আলোকেই দেখান যে, মহাজাগতিক নিয়মের বাইরে মানুষের কোনো বিশেষ ছাড় নেই। একটি ধূমকেতু যেভাবে মহাকর্ষ সূত্রে বাঁধা, মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের আদান-প্রদানও ঠিক তেমনি পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের অমোঘ নিয়মে আবদ্ধ।

২. ভৌত বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বের সীমাবদ্ধতা (The Limits of Physical Science)

রাসেল ভৌত মহাবিশ্বের বিশালতা এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির একটি চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:

“Physical science is thus approaching the stage when it will be complete, and therefore uninteresting… It is like climbing a high mountain and finding nothing at the top except a restaurant where they sell ginger beer, surrounded by fog but equipped with wireless.”

(অনুবাদ: ভৌত বিজ্ঞান এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যেখানে এটি সম্পূর্ণ এবং ফলস্বরূপ অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়বে… এটি যেন একটি উঁচু পাহাড়ে আরোহণ করার মতো, যার চূড়ায় কুয়াশাঘেরা একটি রেস্তোরাঁ ছাড়া আর কিছুই নেই যেখানে আদা-চা বা জিঞ্জার-বিয়ার বিক্রি হয়, তবে সেখানে একটি ওয়্যারলেস সংযোগ রয়েছে।)

বিস্তারিত আলোচনা:

রাসেল বলছেন, মহাবিশ্ব স্থান ও কালের দিক থেকে অসীম নয়, বরং এর একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে (কোয়ান্টাম ও পারমাণবিক তত্ত্বের প্রেক্ষিতে)। ইলেক্ট্রন এবং প্রোটনের গতিবিধি যখন সম্পূর্ণ আবিষ্কার হয়ে যাবে, তখন ভৌত বিজ্ঞান কেবল একটি “ভূগোল” বা তথ্যের তালিকায় পরিণত হবে。 রাসেল রসিকতা করে বলেছেন যে, অসম্পূর্ণ রহস্যের মধ্যে যে তীব্র আনন্দ থাকে, তা বিজ্ঞান পুরোপুরি জেনে ফেলার পর আর থাকবে না। জড় মহাবিশ্বটা নিজের মধ্যে আসলে অত্যন্ত প্রাণহীন ও বৈচিত্র্যহীন।

৩. মানুষের মন এবং মস্তিষ্কের সম্পর্ক (Mind and Brain Structure)

মানুষের চিন্তাভাবনা বা মনের চেতনা কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাসেল বলেন:

“Thoughts seem to depend upon the organization of tracks in the brain in the same sort of way in which journeys depend upon roads and railways. The energy used in thinking seems to have a chemical origin; for instance, a deficiency of iodine will turn a clever man into an idiot.”

(অনুবাদ: রাস্তা এবং রেলপথের ওপর যেভাবে ভ্রমণ নির্ভর করে, ঠিক একইভাবে মস্তিষ্কের ট্র্যাক বা স্নায়ুবিক বিন্যাসের ওপর মানুষের চিন্তাভাবনা নির্ভর করে। চিন্তার জন্য ব্যবহৃত শক্তি রাসায়নিক উৎস থেকে আসে; উদাহরণস্বরূপ, আয়োডিনের অভাব একজন বুদ্ধিমান মানুষকেও জড়বুদ্ধি বা বোকা বানিয়ে দিতে পারে।)

বিস্তারিত আলোচনা:

এখানে রাসেল মনস্তাত্ত্বিক বস্তুবাদ (Materialism) বা ভৌতবাদের পক্ষে যুক্তি দেন। মন কোনো অলৌকিক বা স্বাধীন সত্তা নয়। শরীরের উপাদান এবং মস্তিষ্কের গঠনের ওপরই মন নির্ভরশীল। সামান্য একটি রাসায়নিক উপাদান (যেমন আয়োডিন)-এর তারতম্য যদি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে বদলে দিতে পারে, তবে প্রমাণিত হয় যে আমাদের মন পুরোপুরি আমাদের শারীরিক ও জৈবিক কাঠামোর অধীন।

৪. পরকাল এবং অমরত্বের অসারতা (The Illusion of Immortality)

ধর্মের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো মৃত্যুর পর আত্মার অমরত্ব বা পরকাল। রাসেল বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে এই বিশ্বাসের কঠোর সমালোচনা করে লিখেছেন:

“All the evidence goes to show that what we regard as our mental life is bound up with brain-structure and organized bodily energy. Therefore a drop of water is not immortal; it can be resolved into oxygen and hydrogen.”

(অনুবাদ: সমস্ত প্রমাণ এটাই দেখায় যে, আমরা যাকে আমাদের মানসিক জীবন বলি তা মস্তিষ্কের গঠন এবং সংগঠিত শারীরিক শক্তির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সুতরাং, জলের একটি ফোঁটা যেভাবে অমর নয়—একে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনে ভেঙে ফেলা যায়, মানুষের জীবনও তেমনি।)

বিস্তারিত আলোচনা:

রাসেল যুক্তি দেন, মৃত্যু হলো মানুষের শরীরের সেই সুসংগঠিত শক্তির অবসান বা ভেঙে যাওয়া (demobilization)। পানি ভেঙে গেলে যেমন তার ‘পানির অস্তিত্ব’ বা জলীয় ধর্ম হারিয়ে যায়, তেমনি মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে মানুষের স্মৃতি, চেতনা এবং ব্যক্তিত্বের চিরতরে অবসান ঘটে। বিজ্ঞান মানুষের ব্যক্তিগত অমরত্ব বা পরকালের কোনো প্রমাণ দেয় না।

৫. ধর্ম এবং মানুষের ভয় (Religion as a Product of Fear)

মানুষ কেন ধর্ম ও ঈশ্বরের ধারণা তৈরি করল, তার মনস্তাত্ত্বিক কারণ রাসেল এই অধ্যায়ে উন্মোচন করেছেন:

“Religion is an attempt to overcome this antithesis. If the world is controlled by God, and God can be moved by prayer, we acquire a share in omnipotence.”

(অনুবাদ: ধর্ম হলো প্রকৃতি ও মানুষের এই বৈপরীত্য বা অসহায়ত্বকে কাটিয়ে ওঠার একটি প্রচেষ্টা। পৃথিবী যদি ঈশ্বর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ঈশ্বরকে যদি প্রার্থনার মাধ্যমে রাজি করানো যায়, তবে আমরাও যেন সেই সর্বশক্তিমান ক্ষমতার একটি অংশীদার হয়ে উঠি।)

বিস্তারিত আলোচনা:

মানুষ যখন বুঝতে পারে যে বিশাল ও অন্ধ প্রকৃতির নিয়মের সামনে সে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অসহায়, তখন তার মনে তীব্র ভয়ের জন্ম হয়। এই ভয় থেকে বাঁচতে মানুষ কল্পনা করে নেয় যে, প্রকৃতির পেছনে একজন দয়ালু পিতা (ঈশ্বর) আছেন এবং প্রার্থনার মাধ্যমে তাকে খুশি রাখা সম্ভব。 এটি আসলে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা খোঁজার একটি অবৈজ্ঞানিক চেষ্টা মাত্র。

৬. প্রকৃতির অধীনতা বনাম মানুষের মূল্যের স্বাধীনতা (Subordination to Nature vs. Human Value)

অধ্যায়ের শেষভাগে রাসেল এক অদ্ভুত সুন্দর মানবিক দর্শনের অবতারণা করেন। প্রকৃতির কাছে মানুষ শারীরিকভাবে পরাজিত হলেও, “মূল্যবোধের” দিক থেকে মানুষই শ্রেষ্ঠ। তিনি দুটি ভিন্ন পিঠ তুলে ধরেন:

  • ভৌত বা প্রাকৃতিক দিক: “In the philosophy of nature, we are subordinated to nature, the outcome of natural laws, and their victims in the long run.”(অনুবাদ: প্রকৃতির দর্শনে আমরা প্রকৃতির অধীন, প্রাকৃতিক নিয়মের ফল এবং শেষ পর্যন্ত আমরা প্রকৃতিরই শিকার বা বলি।)
  • মানবিক বা মূল্যবোধের দিক: “We are ourselves the ultimate and irrefutable arbiters of value, and in the world of value Nature is only a part.”(অনুবাদ: আমরা নিজেরাই হলাম মূল্যবোধের চূড়ান্ত এবং অখণ্ডনীয় বিচারক; আর মূল্যবোধের এই জগতে প্রকৃতি কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।)
  • নশ্বর জীবনের সৌন্দর্য: “Happiness is none the less true happiness because it must come to an end, nor do thought and love lose their value because they are not everlasting.”(অনুবাদ: সুখের একদিন অবসান ঘটবে বলেই যে তা সত্য সুখ নয়—এমনটা নয়; তেমনি আমাদের চিন্তা এবং ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয় বলেই তাদের গুরুত্ব বা মূল্য হারিয়ে যায় না।)

বিস্তারিত আলোচনা (উপসংহার):

রাসেল এখানে এক মহান সত্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। প্রকৃতি হয়তো অন্ধ এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মাধ্যমে সে আমাদের ধ্বংস করে দেবে。 কিন্তু ভালো-মন্দ বিচার করার, সুন্দরকে ভালোবাসার এবং সত্যকে জানার যে মানবিক ক্ষমতা বা “মূল্যবোধ” (Values), তা প্রকৃতির নেই; তা কেবল মানুষেরই আছে। প্রকৃতি সুন্দর বা কুৎসিত নয়, মানুষ তার নিজস্ব অনুভূতির আলোকেই প্রকৃতিকে সুন্দর বা অর্থবহ করে তোলে। আমাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী বা নশ্বর, কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের ভালোবাসা, সুখ ও জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান এবং তা অমরত্বের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

সারসংক্ষেপ:

রাসেল প্রথম অধ্যায়ে (Nature and Man) মানুষকে অবাস্তব ধর্মীয় ফ্যান্টাসি থেকে বের হয়ে এসে বৈজ্ঞানিক সত্যকে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, আমরা প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতির শিকার; কিন্তু আমাদের ভেতরের প্রেম, বুদ্ধি এবং নৈতিক মূল্যবোধই আমাদের অস্তিত্বের আসল সার্থকতা।

Author: Raman Kumar Biswas

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *