colorgeo.com

Disaster and Earth Science

ভয়ানক সতীদাহ প্রথা

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সতিদাহ প্রথা হচ্ছে মূলত তৎকালীন হিন্দু নারীর স্বামী মারা যাওয়ার পর একই সাথে সহমরণে যাওয়ার বা একই চিতায় আত্মাহুতি দেওয়ার প্রথা।আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্ট পূর্বে এই প্রথা প্রচলিত ছিল তখনকার সমাজে।

মহাভারত এর কাহিনী তে বর্ণিত আছে পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রীও এই প্রথা অনুসারেই পাণ্ডুর মৃত্যু সংবাদ শুনে স্ব-ইচ্ছায় মৃত্যু বরণ করেন।

তখনকার দিনে কিছু লোভী স্বার্থান্বেষী মানুষের বর্বরতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ হলো এই সতিদাহ প্রথা।একজন জীবন্ত মানুষকে জলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারা।এসকল হিন্দু স্ত্রী কে বলপূর্বক স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করা হত নানাভাবে নানান কুমন্ত্রণা ও কটূক্তির ভয় দেখিয়ে।বিশেষত কোনো ধনী লোকের স্ত্রী মারা গেলে তার আত্মীয়রা তার সম্পত্তি ভোগ বা দখলের জন্য তাদের স্ত্রীদের এই ভণ্ড প্রথার নামে পুড়িয়ে মারত।স্বামীর সাথে মৃত্যুর জন্য সদ্যবিধবা স্ত্রীকে জোরপূর্বক একই চিতায় শুইয়ে পুড়িয়ে দিত আর তার কান্নার আওয়াজ ধামা চাপা দিতে বা ঢাকতে পুজার আয়োজন করত,ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, কাসর ঘন্টা বাজিয়ে এই নরহত্যা উৎসব এ মেতে উঠত তথাকথিত সমাজের এই নরপিশাচরা।তখনকার এক শ্রেণীর হিন্দু মহিলারাও ছিল এই দলের অন্তর্ভূক্ত।তাদের কাছে মনে হত,বিধবাবিবাহ ঠেকাতে বা স্বতিত্ব রক্ষার্থে এই প্রথায় মেনে চলা উচিৎ। একটা জীবন্ত মানুষের প্রাণের চেয়ে তাদের কাছে তাদের স্বতিত্ব রক্ষাই ছিল বড় ব্যাপার। আর সে কারণে সেই পবিত্রতা রক্ষার্থে তারা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সদ্যবিধবা স্ত্রীকে পুকুরে স্নান করাত পোড়ানোর আগে।তারপর নববধূ রূপে সাজিয়ে তারই মৃত স্বামীর সাথে পুড়িয়ে দিত।কান্নার আওয়াজ শুনে সহানুভূতি দেখানোর কেউ ছিল না, আর সেটা যাতে কেউ না করতে পারে, তার জন্য ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এই উৎসব এর আয়োজন।



তাদের আর্তনাদ আর হাহাকার যেনো এখনও আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায় সেসব স্থানে গেলে এখনও মনটা বিষাদে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।কত নিষ্পাপ গৃহবধুর প্রাণ নিয়েছে এই ভয়ংকরী প্রথা।বাংলাদেশে এমন একটি জায়গা হচ্ছে আলমগঞ্জ থেকে তেজগঞ্জ যাবার পথে আছে বিখ্যাত “সতী মাঠ” বা সহমরণ স্থল।এখন তেজগঞ্জ নতুন কলোনির “সংহতি” ক্লাবের ঠিক বিপরীত পাশে।এখানে এখনও আছে সেই পুকুর যেখানে সদ্যবিধবা স্ত্রীকে দাহ করার আগে স্নান করানো হত আর রয়ে গেছে তাদের একটু বেঁচে থাকার আশায় নিদারুণ, নিষ্ফল চিৎকার আর সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত সতী মন্দির।কিন্তু নির্মূলের পথে এখনও আছে সেই জোড়া মন্দির,যেটার একটি কালি মন্দির ও একটি শিব মন্দির।


রাজা রামমোহন রায় ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ডিসেম্বর অনেক বঞ্ছনা লাঞ্ছনা স্বীকার এর পর এই প্রথা বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেসময় তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী তে রাজা রামমোহন রায় এই প্রথার বিরুদ্ধে আইনী বক্তব্য পেশ করেন।আর তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী তে গভর্নর ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক।লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক রাজা রামমোহন এর পেশকৃত আইনী দলীল এর যুক্তির সারবত্তা অনুধাবন করে আইন পাশ করতে উদ্যোগী হন।আর তখনি বাদ সাধল তথাকথিত সেসব ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায় যারা এর মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করত আর লুট করত অন্যের সম্পদ।তারা বিলেত এর প্রিভি কাউন্সিলে এ নিয়ে মামলা করেন রামমোহন এর নামে।কিন্তু রামমোহন ও থেমে থাকেন নি, তিনি সমাজে আন্দোলন সংগ্রাম করে প্রমাণ ও প্রচার করে দেন যে এই প্রথা কেবল অমানবিকই নয়, বরং অশাস্ত্রীয়, নীতিবিরুদ্ধ আর আইনসংগত নয়।এই কারণ এ তিনি এর স্বপক্ষে দাঁড়ানোর জন্য মত বিনিময় করে ৯০০ জন এর স্বপক্ষে এমন ব্যক্তির সই-স্বাক্ষর কৃত দলীল পেশ করেন আর এরই প্রেক্ষিতে লর্ড বেন্টিঙ্ক দলীল পাশ করেন।তারপর উঠল ১৮৩২ সালে প্রিভি কাউন্সিলে সেই আইন আর সেখানেও রামমোহন এর যুক্তি ও পেক্ষাপট বিশ্লেষণ এর জন্য ওয়াকিবহাল থাকে সতিদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তার এই বিরুদ্ধাচারণ।সেটা হয়েছিল বিলেত এ আর রামমোহন কে নিজ অর্থ ব্যয়ে বিলেত পাঠিয়েছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। সেখানে রামমোহন কে তার দক্ষতা আর বুদ্ধির যুক্তির জন্য “রাজা রামমোহন রায়” উপাধি দেওয়া হয়েছিল। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এর ১৮২৯ সালের সতীদাহ আইন বাতিল এর পরপরই ভারতের অন্যান্য অনেক দেশি বিদেশি কোম্পানি এই প্রথা অবরোধ করে উঠিয়ে দেন।আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে থাকে এই প্রথা।

Please follow and like us:

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
%d bloggers like this: