কাওয়ালি জনক আমির খসরু

খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত সুফি সাধক ও দরবেশ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্যত্বে ভারতবর্ষে খ্যাতি লাভ করেন আবুল হাসান ইয়ামিন আল-দিন মাহমুদ ওরফে আমির খসরু।তিনি উত্তর ভারতের ইহাত জেলার পাতিয়াতলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর জন্মসাল সম্পর্কে কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না তবে ১২৫৩-১২৫৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই তাঁর জন্ম।সেসময় ভারতবর্ষের বিখ্যাত বিজেতা চেঙ্গিসখান মঙ্গোলীয়দের আক্রমণের ফলে তাঁর পিতা আমির সাইফুদ্দিন মাহমুদ নিজ বাসস্থান ছেড়ে সপরিবারে হিন্দুস্থানে  চলে আসেন।তাঁর পিতা ছিলেন মধ্য এশিয়ার লা চীনা হাজারা গোত্রীয় ও তুর্কি বংশোদ্ভূত। তাঁর মা বিবি দৌলত নাজ তাকে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে নিয়ে যান তার সংগীত ও কাব্যচর্চার জন্য।তিনি পাতিয়াতলিতে থাকতেই ফার্সি ও হিন্দিতে একাধারে গান ও কাব্য রচনা করতেন,কিন্তু বালক আমির তখন আউলিয়ার দরবারে প্রবেশ না করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ এর জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে কাব্য পাঠ করছিলেন-

           “তুমি সেই সম্রাট, প্রাসাদেরই রাজা

          কবুতর গেলে যেথা হয়ে যায় বাজপাখি

          গরিব পথচারী এসেছে যে দরজায়

          ভেতরে ডাকবে-নাকি ফিরে যাব,জানাবে কি?”




আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারা নিজামুদ্দিন তা কিঞ্চিত শুনেছিলেন,প্রতিউত্তরে তিনি নিজে এসেছিলেন বাইরে অভ্যর্থনা জানাতে বালক আমিরকে আর বলেছিলেন-



             “হে প্রাণের বন্ধু, ভেতরে এসো

               সারাজীবন আমার বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে থেকো

               বোকা মানুষ যদি আসতো

               তাহলে নাহয় সে খালি হাতে ফিরে যেত “



সেখান থেকেই শুরু হয় আমির খসরুর কাব্য রচনা।তিনি নিজামুদ্দিন এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন আর তাদের মধ্যে আধ্যাত্মিক প্রেমের ভাবাবেগ ঘটে,তারা উভয় উভয়কে চিনে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।মাত্র ৭ বছর বয়সেই তিনি তাঁর পিতাকে হারান আর নানা ইমাদুল মুলকের আশ্রয়ে থেকে ৮ বছর থেকেই পাকাপোক্তভাবে কাব্য রচনায় উদ্ভূত করেন নিজের প্রতিভাকে।কেবল ১৬ বছর বয়সেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “তুহফাতুস সিগার”। তাঁর মা ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজপুত রাওয়াত আরজের কন্যা,সেই সুবাদে তিনি বলবনের ভাই এর ছেলে মালিক ছাজ্জুর সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে সক্ষম হন,পাশাপাশি তিনি সেই রাজদরবার এর সবাইকে আকর্ষিত করতে থাকেন তাঁর কাব্যরচনার মাধ্যমে। সেসময় বলবনের ছেলে নাসিরুদ্দিন বুহরা তার প্রতিভাকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন,ফলে তিনি অনেক সুযোগ পান কাব্যচর্চার।আর নাসিরুদ্দিন বুহরা নিয়ে লিখে ফেলেন “কিরান-উস-সাদাইন” নামের মসনভি।

পরবর্তীতে যখন দিল্লীর সালতানাতে খিলজী রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়,তখন জালালউদ্দিন খিলজীর দরবারে তিনি সচিব নিযুক্ত হন।আর আমিরের রাজনৈতিক চিন্তা চেতনায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান জালালউদ্দিন তাকে “আমির খসরু” উপাধিতে ভূষিত করেন।এই কারণে তিনি জালালউদ্দিন খিলজী কে নিয়ে ২য় মসনভি “মিফতাহুল ফুতুহ” রচনা করেন।

জালালউদ্দিন খিলজীর পর দিল্লীর মসনদে বসেন আলাউদ্দিন খিলজী তাঁর সময়ে পুরোপুরি ভাবে কাব্য সাধনা আর সংগীত নিয়ে তিনি চর্চা করেন।আলাউদ্দিন খিলজীর বীরত্বগাঁথা তুলে ধরেন তিনি তাঁর “খাজিনাউল ফুতুহ” নামে একটি কাব্যগ্রন্থে।

এদিকে তিনি নাজিমুদ্দিন আউলিয়ার দরবারে একাধারে সংগীত নিয়ে সৃষ্টি করে চলেছেন নতুন নতুন সুর,তাল,লয়। সুফি,কবি,দার্শনিক যোদ্ধার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একাধারে সংগীতজ্ঞ।আরবি,ফার্সি আর হিন্দিতে তিনি গান লিখে সুর করতেন।ভারতবর্ষের উচ্চাঙ্গ সংগীত কে এগিয়ে নিতে তাঁর অবদান সর্বাধিক। প্রথম যখন হিন্দুস্থানে আসেন তখন তিনি সংস্কৃত জানতেন না আর সেসময়ই ভাঙ্গা ভাঙ্গা সংস্কৃত শব্দ মিলিয়ে তিনি গান রচনা করেন,যা “তারানা” নামে পরিচিত। পরবর্তীতে পারস্য আর ভারতীয় সংগীত মিলিয়ে তিনি তান,তাল ও রাগ সৃষ্টি করেন।

তাঁর সৃষ্ট তাল গুলো হচ্ছে সাওয়ারি,ফিরুদাস্ত,পাহোলিয়ান,জাট,পুস্ত,কাওয়ালি, আড়বৌতালি,জুমড়া,জালদ,ত্রিতাল ইত্যাদি।

রাগ গুলোর মধ্যে আছে সাহগাড়ি,ইয়ামানি,ইশহাক,মুয়াফিক,গানাম,জীলফ,সানাম,সাহানা,খেয়াল,বাসিখ,সারপর্দা,নিগার,বাজরেখ ইত্যাদি।

হযরত আউলিয়ার দরবারে মূলত তিনি গজল আর কাউয়ালি করতেন।কাউয়ালি তাঁরই অনবদ্য সৃষ্টি। পারস্য সংগীত এর ১২ পর্দা আর ভারতীয় রাগ সম্পর্কে আমির খসরু তাঁর অশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত রূপ দিয়েছিলেন একটা সংগীত এই।তিনি আরবি,ফার্সি আর হিন্দি মিলিয়ে কাওল গাইতেন বেশি,যা হযরত এর দরবারে জনপ্রিয় করে তোলে । কাওল মূলত এসেছে আরবি শব্দ থেকে যার অর্থ মূলত কথা বা বাক্য এর কাউয়ালি সৃষ্ট। জনপ্রিয়তার কারণ ছিল তাঁর চমৎকার মনকাড়া সুর আর সহজ, সরল প্রাঞ্জল ভাষা,যা সকলের বোধগম্য আর হৃদয়ঙ্গম হত।কাউয়ালির জনক বলা হত তাঁকে। একইসাথে ৭জন সুলতান এর দরবারে তিনি প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন।তিনিই ভারত ও পাকিস্তানে গজল প্রচলন করেন।এর জন্যই তিনি আউয়ালির দরবারে ভক্তদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন আর “তুত-ই-হিন্দ” অর্থাৎ “ভারতের তোতা” উপাধি পান।আমির খসরু তাঁর গুরু নাজিমুদ্দিন এর এতটাই পছন্দের ছিলেন যে তিনি মৃত্যুর সময় শিষ্যদের বলে যান খসরুর কবর যেন তাঁর পাশে দেওয়া হয়। আমির খসরু তাঁর গুরুর মৃত্যুর পর ৬ মাস ধরে কবরের পাশে বিলাপ করতে করতে সেখানেই মৃত্যু বরণ করেন।

Please follow and like us:

উপমা সাহানী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

Wed Jun 10 , 2020
আধুনিক কালে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতকে বিশৃঙ্খলার পংকোদ্বার হতে উদ্ধার করার জন্য ভারতবর্ষে ২জন মহাপুরুষ এর আবির্ভাব ঘটেছিল।তাদের মধ্যে একজন হলেন পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে।১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ১০ই আগষ্ট বোম্বাই এর বালেশ্বর নামক স্থানে তাঁর জন্ম হয়।ছোটবেলা থেকেই তিনি মায়ের নিকট ভজন গান আর কাশীর বিখ্যাত বমন দাস এর নিকট সেতার শিখেছিলেন।যদিও […]