বার্ট্রান্ড রাসেলের “What I Believe” গ্রন্থের পঞ্চম ও শেষ অধ্যায়টির নাম “Science and Happiness” (বিজ্ঞান এবং সুখ)। প্রথম চার অধ্যায়ে প্রকৃতিতে মানুষের অবস্থান, নৈতিকতা ও সামাজিক মুক্তির পথ দেখানোর পর, এই সমাপনী অধ্যায়ে রাসেল আলোচনা করেছেন কীভাবে আধুনিক বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ প্রকৃত সুখ অর্জন করতে পারে।
রাসেল মনে করেন, বিজ্ঞান মানুষকে প্রকৃতির ওপর বিপুল ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা মানুষকে সুখী করতে পারছে না। কারণ, মানুষের মনের ভেতরের ভয়, হিংসা ও নিষ্ঠুরতা দূর হয়নি। যদি বিজ্ঞানের শক্তিকে সঠিক মনস্তত্ত্ব ও সহানুভূতির সাথে যুক্ত করা যায়, তবেই মানবজাতি সত্যিকারের সুখের সন্ধান পাবে।
নিচে এই অধ্যায়ের মূল ইংরেজি টেক্সট বা উক্তিগুলো (Quotes) সংযুক্ত করে অধ্যায়টির সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বিজ্ঞানের দ্বিমুখী ক্ষমতা: সৃষ্টি বনাম ধ্বংস (The Dual Power of Science)
অধ্যায়ের শুরুতেই রাসেল বিজ্ঞানের ক্ষমতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। বিজ্ঞান নিজে ভালো বা মন্দ নয়, এটি মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে:
“Science has increased man’s power over nature, and might therefore be supposed to have increased his happiness… But if it is used to increase the power of the rulers to oppress the ruled, or of one nation to destroy another, it does not increase happiness.” (অনুবাদ: বিজ্ঞান প্রকৃতির ওপর মানুষের ক্ষমতা বাড়িয়েছে, এবং তাই মনে করা যেতে পারে যে এটি মানুষের সুখও বাড়িয়েছে… কিন্তু একে যদি শাসকের ক্ষমতা বাড়িয়ে শাসিতকে শোষণ করতে ব্যবহার করা হয়, অথবা এক জাতি কর্তৃক অন্য জাতিকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়, তবে তা সুখ বাড়ায় না।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল বলছেন, বিজ্ঞান আমাদের প্রযুক্তি দিয়েছে, চিকিৎসাবিদ্যা দিয়েছে, উৎপাদনের ক্ষমতা দিয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে এর মাধ্যমে মানুষের অনেক বেশি সুখী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বিজ্ঞানের এই শক্তিকে ব্যবহার করছে আরও নিখুঁত ও মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে এবং নাগরিকদের ওপর নজরদারি বা শোষণ বাড়াতে। ফলে, বিজ্ঞান মানুষের সুখ বাড়ানোর বদলে অনেক সময় ভীতি ও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. সুখের প্রধান শত্রু: মানুষের ভয় (Fear as the Enemy of Happiness)
মানুষ কেন বিজ্ঞানের ক্ষমতাকে খারাপ কাজে ব্যবহার করে? এর পেছনে রাসেল মানুষের একটি আদিম মনস্তত্ত্বকে দায়ী করেছেন—তা হলো ‘ভয়’। তিনি লিখেছেন:
“The great obstacle to happiness is fear. We are afraid of each other, we are afraid of poverty, we are afraid of illness… It is fear that makes us cruel, and it is fear that makes us welcome the chains of authority.” (অনুবাদ: সুখের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভয়। আমরা একে অপরকে ভয় পাই, আমরা দারিদ্র্যকে ভয় পাই, আমরা রোগব্যাধিকে ভয় পাই… এই ভয়ই আমাদের নিষ্ঠুর করে তোলে এবং এই ভয়ই আমাদের কর্তৃপক্ষের (স্বৈরাচারী শাসনের) শৃঙ্খলকে স্বাগত জানাতে বাধ্য করে।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেলের মতে, মানুষের মধ্যে যে হিংসা, যুদ্ধংদেহী মনোভাব বা অন্য জাতিকে ধ্বংস করার ইচ্ছা কাজ করে, তার মূলে রয়েছে নিজের অস্তিত্ব হারানোর ভয়। মানুষ যখন ভাবে অন্য দেশ তাকে আক্রমণ করতে পারে, তখন সে নিজে আগে আক্রমণ করতে চায়। এই ভয়ের কারণেই মানুষ নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে স্বৈরাচারী শাসক বা অন্ধ সমাজব্যবস্থার দাসত্ব মেনে নেয়, যাতে তারা কিছুটা নিরাপত্তা পায়।
৩. ভয় দূরীকরণে বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার (Using Science to Eradicate Fear)
রাসেল বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞানের মূল কাজ হওয়া উচিত মানুষের মন থেকে এই সার্বিক ভয় দূর করা। তিনি লিখেছেন:
“Science can, if it chooses, wipe out poverty, and with it the fear of poverty… It can conquer disease, and lessen the fear of death. It can, by proper psychological understanding, diminish the causes of mutual hatred.” (অনুবাদ: বিজ্ঞান যদি চায়, তবে দারিদ্র্য এবং সেই সাথে দারিদ্র্যের ভয়কে মুছে ফেলতে পারে… এটি রোগকে জয় করতে পারে এবং মৃত্যুর ভয় কমাতে পারে। সঠিক মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে, এটি পারস্পরিক ঘৃণার কারণগুলোকেও কমিয়ে দিতে পারে।)
বিস্তারিত আলোচনা: এখানে রাসেল বিজ্ঞানের এক ইতিবাচক ও মানবিক রূপরেখা দিয়েছেন। বিজ্ঞান কেবল কারখানার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নয়, বরং মানুষের জীবনকে নিরাপদ করার জন্য। যখন বিজ্ঞানের সাহায্যে পৃথিবীতে পর্যাপ্ত খাবার থাকবে, উন্নত চিকিৎসা থাকবে এবং মানুষ যখন জানবে যে তার মৌলিক চাহিদাগুলো সুরক্ষিত, তখন সমাজ থেকে অর্থনৈতিক ও অস্তিত্বের ভয় কেটে যাবে। আর ভয় কেটে গেলে মানুষের ভেতরের স্বাভাবিক দয়া ও ভালোবাসা জাগ্রত হবে।
৪. মনস্তত্ত্ব ও শিক্ষার বৈজ্ঞানিক রূপান্তর (Scientific Psychology and Education)
রাসেল কেবল ভৌত বিজ্ঞানের (পদার্থ বা রসায়ন) কথা বলেননি, তিনি মানুষের মন পরিবর্তনের জন্য ‘মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞান’ (Psychology)-এর ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
“We must look to a scientific psychology to teach us how to train the emotions of children, so that they may grow up free from the distorting effects of fear and hatred.” (অনুবাদ: শিশুদের আবেগকে কীভাবে পরিচালিত করতে হবে তা শেখার জন্য আমাদের বৈজ্ঞানিক মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে, যাতে তারা ভয় এবং ঘৃণার বিকৃত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে।)
বিস্তারিত আলোচনা: শৈশব থেকেই মানুষের মনে ভয় ও কুসংস্কার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। রাসেল বলছেন, আধুনিক মনস্তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের অন্ধ আনুগত্য বা যুদ্ধপ্রিয় করে তুলবে না, বরং তাদের মনে কৌতুহল, সাহস, মুক্তচিন্তা এবং অন্যান্য মানুষের প্রতি সহানুভূতির জন্ম দেবে। মানসিক গঠন যদি সুস্থ হয়, তবে মানুষ তার অর্জিত জ্ঞানকে কখনো ধ্বংসের কাজে লাগাবে না।
৫. জীবনের কৃত্রিমতা বনাম প্রাকৃতিক আনন্দ (Artificiality vs. Spontaneous Joy)
আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষকে প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে—রাসেল এই বিষয়েও সতর্ক করেছেন। তিনি লিখেছেন:
“We are suffer from a certain artificiality in our lives; we are too much cut off from the earth and the seasons… A good life must retain some contact with the natural world from which we sprang.” (অনুবাদ: আমরা আমাদের জীবনের এক ধরনের কৃত্রিমতায় ভুগছি; আমরা পৃথিবী এবং ঋতুচক্র থেকে অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি… একটি ভালো জীবনের জন্য অবশ্যই সেই প্রাকৃতিক জগতের সাথে কিছুটা যোগাযোগ বজায় রাখা উচিত, যেখান থেকে আমাদের উৎপত্তি।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল মনে করিয়ে দেন যে, অতিরিক্ত যান্ত্রিক ও কৃত্রিম জীবন মানুষকে একঘেয়েমি ও বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য দেবে ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভেতরের যে সহজাত আনন্দ (Spontaneous Joy)—যা মাটির স্পর্শে, খোলা আকাশে, বা প্রকৃতির সান্নিধ্যে পাওয়া যায়—তা যেন হারিয়ে না যায়। প্রকৃত সুখের জন্য বিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রকৃতির সাথে এই আত্মিক বন্ধন ধরে রাখা জরুরি।
অধ্যায়ের উপসংহার ও সমগ্র গ্রন্থের মূল বার্তা
অধ্যায়ের একেবারে শেষভাগে এসে রাসেল তার পুরো বইয়ের দর্শনকে এক লাইনে সংক্ষেপে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন:
“The world that we must seek is a world in which the creative spirit is alive, in which life is an adventure full of joy and hope, based rather upon the impulse to construct than upon the desire to retain what we possess or to conquer what is possessed by others.” (অনুবাদ: আমাদের এমন একটি পৃথিবীর সন্ধান করতে হবে যেখানে সৃজনশীল চেতনা বেঁচে থাকবে, যেখানে জীবন হবে আনন্দ ও আশায় ভরপুর একটি রোমাঞ্চ; যা কোনো কিছু আঁকড়ে ধরার বা অন্যের জিনিস কেড়ে নেওয়ার ইচ্ছার চেয়ে—নতুন কিছু ‘সৃষ্টি করার’ প্রেরণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।)
সারসংক্ষেপ: “What I Believe” গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে রাসেল আমাদের এই চূড়ান্ত শিক্ষা দেন যে, বিজ্ঞান মানুষকে কেবল ‘ক্ষমতা’ দিতে পারে, কিন্তু ‘সুখ’ দিতে পারে না। সুখ আসে মানুষের ভেতর থেকে, যখন মানুষের মন ভয় ও হিংসা থেকে মুক্ত হয়।
বিজ্ঞান যখন মানুষের পাশবিক ভয়গুলোকে দূর করতে ব্যবহৃত হবে এবং মানুষের মনে নতুন কিছু সৃষ্টি করার, অন্যকে ভালোবাসার এবং জীবনকে উপভোগ করার প্রেরণা জোগাবে—तখনই বিজ্ঞান ও সুখের মিলন ঘটবে এবং এই পৃথিবী মানুষের জন্য একটি স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে।