Bartrand Russell What I believe, Chapter 4

বার্ট্রান্ড রাসেলের “What I Believe” গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়: “Salvation: Individual and Social” (মুক্তি: ব্যক্তিগত এবং সামাজিক)

বার্ট্রান্ড রাসেলের “What I Believe” গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়টির নাম “Salvation: Individual and Social” (মুক্তি: ব্যক্তিগত এবং সামাজিক)। আগের অধ্যায়গুলোতে মানুষের অস্তিত্ব, ভালো জীবন এবং নৈতিকতা নিয়ে আলোচনার পর, এই অধ্যায়ে রাসেল আলোচনা করেছেন মানুষের ‘মুক্তি’ বা ‘কল্যাণ’ কীভাবে অর্জিত হতে পারে।

প্রচলিত ধর্মগুলো সবসময় মানুষের ‘ব্যক্তিগত মুক্তি’ (যেমন: নিজের আত্মার পবিত্রতা বা নিজের পরকালের লাভ)-র ওপর জোর দিয়ে এসেছে। কিন্তু রাসেল এই ধারণাকে আধুনিক যুগের উপযোগী নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান ও সমাজব্যবস্থার কারণে মানুষের জীবন একে অপরের সাথে এতটা গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে যে, সমাজকে বাদ দিয়ে একা একা কখনো প্রকৃত মুক্তি বা সুখ লাভ করা সম্ভব নয়।

নিচে এই অধ্যায়ের মূল ইংরেজি টেক্সট বা উক্তিগুলো (Quotes) সংযুক্ত করে অধ্যায়টির সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ব্যক্তিগত মুক্তির সনাতন ধারণা ও তার সীমাবদ্ধতা (Traditional Idea of Individual Salvation)

অধ্যায়ের শুরুতেই রাসেল পুরোনো ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাধারায় মুক্তির যে রূপ ছিল, তা তুলে ধরেছেন:

“The old religions, for the most part, were concerned with individual salvation… They thought of a man as an isolated soul, whose relations to God were the only ones that really mattered.” (অনুবাদ: পুরোনো ধর্মগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিগত মুক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিল… তারা মানুষকে একটি বিচ্ছিন্ন আত্মা হিসেবে ভাবত, যার সাথে ঈশ্বরের সম্পর্কটাই ছিল একমাত্র সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।)

বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল বলছেন, প্রাচীনকালের সাধু-সন্ন্যাসীরা বা ধর্মীয় গুরুরা মনে করতেন, সমাজ থেকে দূরে কোনো পাহাড়ে বা বনে গিয়ে ধ্যান করে নিজের আত্মাকে পাপমুক্ত করাই হলো জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। সেখানে সমাজ বা অন্য মানুষের কী হলো, তা নিয়ে তাদের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু রাসেল মনে করেন, মানুষকে এভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবা সম্পূর্ণ অবাস্তব। মানুষ কোনো দ্বীপ নয় যে একা একা টিকে থাকবে; মানুষ একটি সামাজিক জীব।

২. আধুনিক যুগে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (Interdependence in the Modern World)

আধুনিক বিজ্ঞান ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে কীভাবে একে অপরের পরিপূরক করে তুলেছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাসেল লিখেছেন:

“In the modern world, we are interconnected as never before… You cannot be a good man in a bad society, or at any rate, you cannot avoid participating in the evils of your time.” (অনুবাদ: আধুনিক বিশ্বে আমরা এমনভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত, যা আগে কখনো ছিল না… একটি খারাপ সমাজে আপনি একা ভালো মানুষ হতে পারেন না, অথবা অন্ততপক্ষে, আপনার যুগের মন্দের অংশীদার হওয়া থেকে আপনি নিজেকে বাঁচাতে পারবেন না।)

বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল এক গভীর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বর্তমান যুগে আপনি যে খাবার খাচ্ছেন, যে পোশাক পরছেন, বা যে প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছেন—তার পেছনে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষের শ্রম জড়িয়ে আছে। সমাজ যদি শোষণের ওপর ভিত্তি করে চলে, তবে আপনি পরোক্ষভাবে সেই শোষণের অংশীদার হয়ে যাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি এমন একটি দেশে থাকেন যা অন্য দেশের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, তবে নাগরিক হিসেবে আপনার ট্যাক্সের টাকাই সেই যুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। অতএব, সমাজকে অন্যায় ও কুৎসিত রেখে আপনি একা নিজের ঘরে বসে ‘পবিত্র’ বা ‘মুক্ত’ থাকার দাবি করতে পারেন না।

৩. সামাজিক মুক্তি ও বিজ্ঞানের ভূমিকা (Social Salvation and the Power of Science)

রাসেলের মতে, মানুষের প্রকৃত মুক্তি কেবল আধ্যাত্মিক সাধনায় নয়, বরং সমষ্টিগত বা সামাজিক উন্নয়নে নিহিত। তিনি লিখেছেন:

“Social salvation demands two things: an economic system which does not breed injustice, and an international order which prevents war.” (অনুবাদ: সামাজিক মুক্তির জন্য দুটি জিনিস প্রয়োজন: একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা অন্যায়ের জন্ম দেয় না, এবং একটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা যা যুদ্ধ রোধ করে।)

বিস্তারিত আলোচনা: এখানে রাসেল সামাজিক মুক্তির বাস্তব রূপরেখা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, মানুষের দুঃখের মূল কারণ দুটি—অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং যুদ্ধের ভয়। যদি এমন একটি সমাজ তৈরি করা যায় যেখানে সম্পদ বা সুযোগের সুষম বণ্টন থাকবে (অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার) এবং বিশ্বব্যাপী এমন একটি ব্যবস্থা থাকবে যা জাতিগত সংঘাত বা যুদ্ধ থামাবে, তবেই মানবজাতি সামগ্রিকভাবে মুক্তি পাবে। আর এই কাজগুলো করার জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞান, সুশাসন এবং যৌথ প্রচেষ্টা।

৪. বিপ্লব বনাম ধীরগতির সামাজিক পরিবর্তন (Revolution vs. Gradual Progress)

সমাজ পরিবর্তনের উপায় হিসেবে অনেকেই হঠাৎ করে রক্তক্ষয়ী বিপ্লব (Catastrophic Revolution)-এর কথা বলেন। রাসেল এই উগ্র সমাজ পরিবর্তনের ধারণার সমালোচনা করে লিখেছেন:

“I do not believe that the social salvation of mankind can be achieved by a sudden, catastrophic change… Sudden changes leave men’s habits unchanged, and therefore lead back to the old evils under new names.” (অনুবাদ: আমি বিশ্বাস করি না যে মানবজাতির সামাজিক মুক্তি কোনো হঠাৎ, বিপর্যয়কর পরিবর্তনের (বিপ্লবের) মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে… আকস্মিক পরিবর্তন মানুষের অভ্যাসগুলোকে পরিবর্তন করতে পারে না, এবং ফলস্বরূপ তা নতুন নামে পুরোনো মন্দগুলোকেই ফিরিয়ে আনে।)

বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একজন শান্তিবাদী ও ধীরস্থির চিন্তাবিদ ছিলেন। তিনি রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও অন্যান্য বড় বড় বিপ্লবকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, অস্ত্রের জোরে রাতারাতি সরকার বা ব্যবস্থা বদলে ফেলা যায় ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভেতরের হিংসা, ক্ষমতার লোভ বা নিষ্ঠুরতার মানসিকতা রাতারাতি বদলায় না। ফলে, বিপ্লবের পর নতুন শাসকরাও পুরোনো শাসকদের মতোই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তাই রাসেলের মতে, সত্যিকারের মুক্তি আসবে ধীরগতির এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সহানুভূতির মাধ্যমে।

৫. ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক নিয়মের ভারসাম্য (Individual Liberty and Social Harmony)

সামাজিক মুক্তির কথা বলতে গিয়ে রাসেল আবার মানুষকে রাষ্ট্রের গোলাম বানিয়ে ফেলারও বিরোধী ছিলেন। তিনি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্যের কথা বলেছেন:

“We want a community where people can be happy, and they cannot be happy if they are atoms crushed by a giant machine.” (অনুবাদ: আমরা এমন একটি সমাজ চাই যেখানে মানুষ সুখী হতে পারে; আর মানুষ যদি একটি বিশাল যন্ত্রের (রাষ্ট্রের) নিচে পিষ্ট হওয়া পরমাণুর মতো হয়ে যায়, তবে তারা সুখী হতে পারে না।)

বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল সতর্ক করে দিয়েছেন যে, সমাজের কল্যাণ করতে গিয়ে যেন আমরা ব্যক্তির স্বাধীনতা (Individual Liberty) কেড়ে না নিই। রাষ্ট্র বা সমাজ যেন এমন এক দানবীয় যন্ত্র না হয়ে ওঠে যা মানুষের নিজস্ব চিন্তা, শিল্পকলা বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে পিষে ফেলে (যেমনটা ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে ঘটে)। সমাজ এমন হওয়া উচিত যা মানুষের সৃজনশীলতা ও আনন্দকে বিকশিত হতে সাহায্য করবে, তাকে দমন করবে না।

উপসংহার ও সারসংক্ষেপ

“What I Believe”-এর চতুর্থ অধ্যায়ের মূল বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। রাসেল আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, আধুনিক যুগে ‘মুক্তি’ বা ‘কল্যাণ’ কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়—এটি একটি সমষ্টিগত লক্ষ্য।

আমরা যদি সত্যিই সুখী ও মুক্ত হতে চাই, তবে আমাদের কেবল নিজেদের স্বার্থ বা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে ভাবলে চলবে না; আমাদের এমন একটি বিশ্বসমাজ (World Society) গড়ে তুলতে হবে যা যুদ্ধমুক্ত হবে, যেখানে অর্থনৈতিক সমতা থাকবে এবং যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে। সংক্ষেপে, ব্যক্তির মুক্তি লুকিয়ে আছে সমাজের মুক্তির ভেতরেই।

Author: Raman Kumar Biswas

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *