বার্ট্রান্ড রাসেলের “What I Believe” গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়টির নাম “Moral Rules” (নৈতিক নিয়মাবলি)। প্রথম দুই অধ্যায়ে মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান এবং ‘ভালো জীবন’-এর সংজ্ঞা দেওয়ার পর, এই অধ্যায়ে রাসেল সমাজে প্রচলিত নৈতিক নিয়ম ও আইনকানুনের তীব্র ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
রাসেলের মতে, সমাজ ও ধর্মের তৈরি করা অধিকাংশ নৈতিক নিয়মই যুক্তি বা বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং গড়ে উঠেছে প্রাচীন কুসংস্কার, ভয় এবং প্রতিশোধস্পৃহার ওপর। তিনি প্রথাগত অন্ধ নৈতিকতার পরিবর্তে এমন এক প্রগতিশীল নৈতিকতার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, যা মানুষের বাস্তব সুখ এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে।
নিচে এই অধ্যায়ের মূল ইংরেজি টেক্সট বা উক্তিগুলো (Quotes) সংযুক্ত করে অধ্যায়টির সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রচলিত নৈতিকতার ভিত্তি: কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস (The Basis of Traditional Morals)
অধ্যায়ের শুরুতেই রাসেল প্রচলিত নৈতিক নিয়মের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন:
“The traditional morals of our day are a curious mixture of utilitarianism and superstition… But the superstitious element is much the stronger, and it is this that gives the peculiar flavor to the word ‘moral’.” (অনুবাদ: আমাদের যুগের ঐতিহ্যবাহী নৈতিকতা হলো উপযোগবাদ (বাস্তব উপযোগিতা) এবং কুসংস্কারের একটি অদ্ভুত মিশ্রণ… তবে কুসংস্কারের অংশটিই এখানে অনেক বেশি শক্তিশালী, আর এটিই ‘নৈতিক’ শব্দটিকে একটি বিশেষ অন্ধ রূপ দেয়।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল বলছেন, কিছু নৈতিক নিয়ম সমাজে টিকে আছে কারণ সেগুলো সত্যিই মানুষের উপকারে আসে (যেমন: চুরি না করা বা খুন না করা)। কিন্তু সমাজের বেশিরভাগ নিয়মই তৈরি হয়েছে প্রাচীন ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে, যার সাথে আধুনিক মানুষের বাস্তব সুখের কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ কোনো নিয়মকে ভালো-মন্দের বিচারে পরিমাপ না করে, কেবল ‘পূর্বপুরুষরা বলে গেছেন’ বা ‘ঐশ্বরিক আদেশ’ মনে করে অন্ধভাবে মেনে চলে। রাসেল এই অন্ধ আনুগত্যের তীব্র বিরোধী।
২. যৌন নৈতিকতা এবং অবৈজ্ঞানিক বিধিনিষেধ (Sexual Morality and Dogma)
এই অধ্যায়ে রাসেল তৎকালীন সমাজের যৌন নৈতিকতা, বিবাহ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন:
“The harm done by superstitious morals is very great. Take, for example, the question of birth control. The theological opposition to it is based upon the view that certain actions are ‘sinful’ in themselves, quite apart from their consequences.” (অনুবাদ: কুসংস্কারাচ্ছন্ন নৈতিকতার দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। উদাহরণস্বরূপ, জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ধরা যাক। এর বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিরোধিতা মূলত এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে, কিছু কাজ তাদের ফলাফলের কথা বিবেচনা না করেই নিজেদের মধ্যেই ‘পাপ’।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল বলছেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে একটি দরিদ্র পরিবার অতিরিক্ত সন্তানের করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে পারে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং সমাজ অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ থেকে রক্ষা পায়। অর্থাৎ, এর ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু সনাতন নৈতিকতা বা ধর্মতত্ত্ব ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে কেবল একটি নিয়মকে ‘পাপ’ বলে ঘোষণা করে মানুষকে কষ্ট দেয়। রাসেল মনে করেন, কোনো কাজ নিজে নিজেই ‘পাপ’ বা ‘পুণ্য’ হতে পারে না; কাজের ভালো-মন্দ নির্ধারণ করতে হবে তার ফলাফল (Consequences) দেখে।
৩. অপরাধ এবং শাস্তির মনস্তত্ত্ব: প্রতিশোধ বনাম চিকিৎসা (Crime and Punishment)
অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থার পেছনে মানুষের যে আদিম ও হিংস্র মনস্তত্ত্ব কাজ করে, রাসেল তা উন্মোচন করেছেন। তিনি লিখেছেন:
“The traditional view of punishment is that it is a just retribution for sin… My own view is that the treatment of crime should be purely medical and educational.” (অনুবাদ: শাস্তির ঐতিহ্যগত ধারণা হলো এটি পাপের একটি ন্যায্য প্রতিশোধ… আমার নিজস্ব মতামত হলো, অপরাধের প্রতিকার হওয়া উচিত পুরোপুরি চিকিৎসা এবং শিক্ষামূলক।)
বিস্তারিত আলোচনা: সমাজ যখন কোনো অপরাধীকে শাস্তি দেয়, তখন তথাকথিত ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘নৈতিকতা’র আড়ালে আসলে নিজেদের ভেতরের জমে থাকা হিংসা ও প্রতিশোধের আনন্দ (Revenge) চরিতার্থ করে। রাসেল অপরাধকে একটি সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি হিসেবে দেখছেন। তিনি একটি চমৎকার তুলনা দিয়ে বলেন, একজন মানুষ যদি ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়, তবে আমরা তাকে সমাজের সুরক্ষার স্বার্থেই আলাদা বা কোয়ারেন্টাইন করে রাখি, কিন্তু তাকে ঘৃণা করি না বা প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে মারধর করি না। অপরাধীদের ক্ষেত্রেও একই নীতি খাটা উচিত। তাদের সমাজে আটকে রাখা দরকার ঠিকই, কিন্তু তা হতে হবে তাদের সংশোধনের জন্য, শিক্ষার জন্য এবং চিকিৎসার জন্য—প্রতিশোধের জন্য নয়।
৪. অন্ধ জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের নৈতিকতা (Nationalism and War)
ব্যক্তিগত নৈতিকতার বাইরে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক নৈতিকতার ভণ্ডামি নিয়ে রাসেল লিখেছেন:
“The state is a tool for the coercion of the subject, and for aggression against other states… Nationalism is a superstitious extension of the herd-instinct.” (অনুবাদ: রাষ্ট্র হলো তার নাগরিকদের বাধ্য করার এবং অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর একটি হাতিয়ার… জাতীয়তাবাদ হলো মানুষের দলবদ্ধ হয়ে থাকার আদিম প্রবৃত্তির একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সম্প্রসারণ।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেল দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র ‘দেশপ্রেম’ বা ‘জাতীয়তাবাদ’-কে একটি পরম নৈতিক গুণ হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরে। এই কৃত্রিম নৈতিকতার ফাঁদে পড়ে মানুষ নিজের দেশের অন্যায়কেও অন্ধের মতো সমর্থন করে এবং অন্য দেশের নিরীহ মানুষকে শত্রু মনে করতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ও ধ্বংস ডেকে আনে। রাসেল এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাবাদী আন্তর্জাতিকতাবাদের কথা বলেছেন।
৫. নতুন নৈতিকতার মূল ভিত্তি: মানুষের সুখ (The Foundation of New Morals)
অধ্যায়ের শেষভাগে রাসেল এমন এক নৈতিকতার রূপরেখা দিয়েছেন যা মানুষকে খাঁটি আনন্দ দেবে। তিনি লিখেছেন:
“The moral rules which I can approve are those which tend to increase the happiness and lessen the suffering of mankind.” (অনুবাদ: আমি কেবল সেই নৈতিক নিয়মগুলোকেই অনুমোদন করতে পারি, যা মানবজাতির সুখ বৃদ্ধি করতে এবং দুঃখ-কষ্ট কমাতে সাহায্য করে।)
বিস্তারিত আলোচনা: রাসেলের নৈতিক দর্শনের মূল কথাই হলো উপযোগবাদ (Utilitarianism) এবং মানবিকতা। কোনো অলৌকিক কিতাব বা ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য মানুষকে কষ্ট দেওয়ার নাম নৈতিকতা নয়। যে নিয়ম মানুষের জীবনকে সহজ করে, সমাজে শান্তি আনে এবং মানুষের দুঃখ দূর করে, সেটাই সত্যিকারের নৈতিক নিয়ম।
উপসংহার ও সারসংক্ষেপ
“What I Believe”-এর তৃতীয় অধ্যায়ে রাসেল আমাদের এই বার্তা দেন যে, সমাজকে যদি সত্যিই সুন্দর করতে হয়, তবে শতাব্দী প্রাচীন স্থবির নৈতিক নিয়মগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। যৌক্তিক চিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সহানুভূতির আলোকেই আমাদের নতুন নৈতিক নিয়ম তৈরি করতে হবে, যার একমাত্র লক্ষ্য হবে—মানুষের বাস্তব জীবনের সুখ এবং দুঃখের অবসান।